সারাদেশ

বেইলি রোডে আগুনে ৪৬ জনের মৃত্যু: ১৩ আসামিকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা

দুই বছর আগে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ এর সাততলা ভবনে আগুন লেগে ৪৬ জনের মৃত্যুর মামলায় ২২ জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডির দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছে আদালত। এদের মধ্যে ১৩ জন পলাতক থাকায় তাদের গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হয়। গতকাল রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে এ পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। আগামী ১৯ মে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমার দিন রাখার কথা জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম। আসামিদের মধ্যে নয়জন জামিনে রয়েছেন। তারা হলেন-কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক জেইন উদ্দিন জিসান, কাচ্চি ভাই, খানাজ ও তাওয়াজ রেস্তোরাঁর স্বত্ত্বাধিকারী মো. সোহেল সিরাজ, জেস্টি রেস্তোরাঁর মোহর আলী পলাশ ও মো. ফরহাদ নাসিম আলীম, চায়ের চুমুক কফিশপের স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, ফুকো রেস্তোরাঁর স্বত্ত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মতিন, ভবনের ষষ্ঠ তলার ব্যবস্থাপক মো. নজরুল ইসলাম খাঁন, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মুন্সি হামিমুল আলম বিপুল ও চায়ের চুমুক কফিশপের স্বত্ত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক। যারা পলাতক রয়েছেন, তারা হলেন-আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের স্বত্ত্বাধিকারী মো. রমজানুল হক নিহাদ, মেজবানিখানা রেস্তোরাঁর স্বত্ত্বাধিকারী লতিফুর নেহার, খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও অঞ্জন কুমার সাহা, অ্যামব্রোশিয়া রেস্তোরাঁর স্বত্ত্বাধিকারী মো. মুসফিকুর রহমান, পিৎজাইন রেস্তোরাঁর স্বত্ত্বাধিকারী জগলুল হাসান, স্ট্রিট ওভেন রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী আশিকুর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ তারেক, ফুকো রেস্তোরাঁর স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ, মো. সাদরিল আহম্মেদ শুভ, আদিব আলম, রাফি উজ-জাহেদ ও শাহ ফয়সাল নাবিদ। গেল ২ এপ্রিল মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির ইন্সপেক্টর শাহজালাল মুন্সী। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও মারা যাওয়ায় স্পেস মালিক এ. কে নাসিম হায়দার ও ক্যাপ্টেন সরদার মো. মিজানুর রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতি সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে থাকা মো. আনোয়ার হোসেন সুমন ও শফিকুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এজন্য তাদেরও অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত তাদের অব্যাহতি দিয়েছে। মামলার তদন্তকালে ১১ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে সুমন ও রিমন ছিলেন। বাকিরা আসামিরা পলাতক রয়েছেন। অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী বলেন, “ঢাকার বেইলি রোডের ২ নম্বর গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে একাধিক রেস্টুরেন্ট ও কফিশপ পরিচালিত হয়ে আসছিল। “তদন্তে জানা যায়, ভবনটির অনুমোদিত নকশা অমান্য করে নবম তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয় এবং আবাসিক অংশসহ পুরো ভবনই বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট ও কফিশপের কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা জরুরি নির্গমন পথ ছিল না।” অভিযোগপত্রে বলা হয়, “‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টে আগুন লাগার পর প্রধান ফটক বন্ধ হয়ে যায়, যা বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। তদন্তে উঠে এসেছে, বিল পরিশোধ ছাড়া কেউ যাতে বের হতে না পারে এমন অনিয়মিত প্রথার অংশ হিসেবে ফটক বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং আগুনের মুহূর্তেও তা খোলা হয়নি। “ফলে ভেতরে থাকা মানুষজন বের হতে না পেরে ঘন ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শ^াসরোধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন ও পরে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান। এ রেস্টুরেন্টেই সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটে।” এছাড়া বিভিন্ন তলায় দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি ইন্টেরিয়র, গ্যাস সিলিন্ডারের উপস্থিতি এবং ছাদে অবৈধ স্থাপনার কারণে খোলা জায়গার অভাব আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয় এবং মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধা দেয়। ফলে ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে অনেকে দিক হারিয়ে ফেলেন এবং বের হওয়ার সুযোগ পাননি বলে তদন্তের বরাতে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে গ্রিন কোজি কটেজ এর সাততলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ৮ জন শিশু প্রাণ হারায়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে। এ ঘটনায় রমনা মডেল থানার এসআই মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার পায় সিআইডি পুলিশ। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ঘটনার দিন রাত পৌনে ১০টার দিকে ওই ভবনের নিচ তলার ‘চুম্বক’ নামের রেস্তোরাঁয় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের কারণে ভবনটিতে আগুন লাগে এবং প্রচন্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া পুরো ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা রেস্টুরেন্টে আগত নারী, পুরুষ, শিশু আটকা পড়েন। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ভবনটির স্বত্ত্বধিকারী এবং ম্যানেজার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বেশ কিছু রেস্তোরাঁর এবং দোকান ভাড়া দেন। রেস্তোরাঁগুলো যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই রান্নার কাজে গ্যাসের সিলিন্ডার এবং চুলা ব্যবহার করে থাকে। মামলায় ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়, ভবনটির নিচ তলায় থাকা রেস্তোরাঁর রান্নার কাজে অবহেলা ও অসাবধানতা মূলকভাবে মজুদ করে রাখা এই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হয় এবং এই আগুনের তাপ ও প্রচন্ড ধোয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে বিভিন্ন ফ্লোরে অবস্থিত রেস্তোরাঁ ও দোকানে অবস্থানকারী লোকজন আগুনে পুড়ে ও ধোঁয়া শ^াসনালীতে ঢ়ুকে শ^াসরুদ্ধ হয়ে মারা যান এবং গুরুতর আহত হন।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!