আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উদ্ভাবন ব্যবহারের ওপর জোর স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর

ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত অনেক প্রযুক্তি ও রাসায়নিক আগের মতো কার্যকরভাবে কাজ করছে না। তাই দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি ও রাসায়নিক পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে এর কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন। গতকাল সোমবার রাজধানীর রমনায় আইইবি ভবনের সেমিনার হলে সমাজকল্যাণমূলক সংগঠন ইয়ুথ টু ওয়ার্ল্ড আয়োজিত এক সেমিনারে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ইয়ুথ টু ওয়ার্ল্ডের প্রধান উপদেষ্টা এ. এন. এইচ. আখতার হোসাইনের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (অ্যাব) আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন। মির্জা ফখরুল বলেন, ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে সরাসরি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করছি। এসময় তিনি মশা নিয়ন্ত্রণে দেশীয় উদ্ভাবনের উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত রাসায়নিক বা প্রযুক্তি সফল হলে তা সরকারের মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করবে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে বিদেশ থেকে রাসায়নিক আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, সরকারি ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং লার্ভা নিধন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন দেশীয় প্রযুক্তি যুক্ত হলে মশা নিয়ন্ত্রণে আরও ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হবে। দেশীয় উদ্ভাবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষক ও উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা এবং সফল হলে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া। তিনি এ ধরনের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান এবং মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সরকার, গবেষক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সেমিনারে বাংলাদেশি উদ্ভাবক এম. এ. হামিদ মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লার্ভা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির স্থানীয় উদ্ভাবন ও উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার হবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এম. এ. হামিদ বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়; সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এটি সফল করা সম্ভব। সিটি কর্পোরেশনগুলো যদি উন্মুক্ত স্থান, নালা-নর্দমা ও জলাবদ্ধ এলাকায় নিয়মিত লার্ভা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নিরাপদ প্রযুক্তি মানুষের নাগালে পৌঁছে দেয়, তাহলে পরিবারগুলোও নিজ নিজ বাসাবাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, দেশে অনেক মেধাবী উদ্ভাবক রয়েছেন, যারা নানামুখী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে তাদের উদ্ভাবন বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। তিনি বলেন, উদ্ভাবক ইঞ্জিনিয়ার হামিদ দীর্ঘদিন আগেই তার উদ্ভাবনের কাজ সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু সময়মতো সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পেলে এটি ইতোমধ্যে উৎপাদন পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হতো। শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ইঞ্জিনিয়ার হামিদের উদ্ভাবন ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ায় স্বীকৃতি পেয়েছে এবং তিনি সেখানে পুরস্কৃত হয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে একই উদ্ভাবন নিয়ে তাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। এ ধরনের দেশীয় উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। তাই দেশীয় প্রযুক্তিটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। যদি এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল প্রযুক্তি বা উপকরণ আমদানির প্রয়োজন কমবে এবং দেশীয় উদ্ভাবনই কার্যকর সমাধান দিতে পারবে। মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে কেবল সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে এই ইঞ্জিনিয়ার বলেন, সরকার, সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় কমিউনিটি এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং কোথাও যেন পরিষ্কার পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ ধরনের সম্মিলিত উদ্যোগই ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বক্তারা বলেন, দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।




