জাতীয়প্রধান খবর

সেমিকন্ডাক্টর খাত অর্থনীতির নতুন গন্তব্য: প্রধানমন্ত্রী

সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী পদার্থের শিল্প বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক গন্তব্য হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “সীমাবদ্ধতা প্রতিকূলতা এবং নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষি, পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয় এবং ডিজিটাল সেবায় সফলতা দেখিয়েছে। আমাদের মেধাবী তারুণ্য দক্ষ এবং উদ্যমী জনশক্তির উদ্ভাবন শক্তির ওপরে ভর করে যেটি আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি-পোশাক শিল্পের পরে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনার অর্থনৈতিক মূল গন্তব্য। “এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বিশ্বিবিদ্যালয়, শিল্পখাত পেশাজীবী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য বিনীত আহ্বান জানাই।” গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বায়োটেকনোলজি, ইলেকট্রনিক্স, এআই ও রোবোটিক্স সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ঢাকায় নভোথিয়েটারে দুই দিনের এ আয়োজন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “এই সামিট থেকে নতুন নতুন অংশীদারত্ব গবেষণা উদ্যোগ, বিনিয়োগের সুযোগ এবং উদ্ভাবনী চিন্তার জন্ম হবে ইনশাল্লাহ; যা বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।” সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী হলো এমন পদার্থ, যার বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা-পরিবাহী (রুপা, তামা) ও অপরিবাহীর (কাচ, কাঠ) মাঝামাঝি। এর তাপমাত্রা পরিবর্তন করে বা অন্য পদার্থ মিশিয়ে-কতটুকু বিদ্যুৎ যাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বর্তমান সময়ে ইলেকট্রনিক্স জগতের প্রায় পুরোটাই যেমন, স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও ল্যাপটপের প্রসেসর; র‌্যাম, এসএসডি, পেনড্রাইভ, এলইডি লাইট, সোলার প্যানেল, টেলিভিশন, গাড়ি-সবকিছুই সেমিকন্ডাক্টরের ওপর নির্ভরশীল। অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধান তারেক রহমান বলেন, “২০৩০ সালের দিকে বিশে^ গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে সংশ্লিষ্টরা এমনই ধারণা করেছিলেন। তবে খুব সম্ভবত ২০২৬ সালের মধ্যেই সেই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। “সুতরাং, এই মার্কেটে প্রবেশ করার জন্য বাংলাদেশের সামনেও এক অপার সুযোগ এবং সম্ভাবনা বিদ্যমান।” ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ)। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি আশা করি, ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেটি পূরণ করতে সক্ষম হবে। “বাংলাদেশের তিন হাজারেরও বেশি সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী বর্তমানে আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ^বিদ্যালয়ে যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছেন; ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, গবেষক, ম্যানেজার, উদ্যোক্তা হিসেবে অবদান রাখছেন। “প্রবাসে বিশ^স্বীকৃত এসব মেধাবীদেরকে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার ব্যাপারেও সরকারি-বেসরকারি সকল পর্যায় থেকেই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

‘সেমিকন্ডাক্টর এখন জাতীয় অগ্রাধিকারে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং, এমবেডেড সিস্টেম, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং-এইসব ক্ষেত্রে কাজ শুরু হয়েছে। দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে। সেমিকন্ডাক্টর খাতকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে আমরা বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার। “তবে এই খাতের উন্নয়নে খুব সম্ভবত কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন। এই মিশনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, একইসঙ্গে আমি মনে করি-বিশ^বিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, উদ্যোক্তা এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞ সবার আমাদের দায়িত্ব। সেই লক্ষ্য পূরণে বর্তমান সরকার বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিতে চলতি বাজেটে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের চাহিদা অনুযায়ী সকল সুবিধা নিশ্চিত করেছে।” সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সবধরনের শুল্ক বাজেটে প্রত্যাহার করা হয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। “একইসঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকা স্টার্টআপ অনুদান বরাদ্দ রেখেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্টার্টআপ অনুদান বিতরণ করা হয়েছে।”

বায়োটেক পার্ক নির্মাণ প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার ইতোমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কর সুবিধা এবং বন্ডেজ সুবিধা প্রদান এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে কাজ করার জন্য। “বিদ্যমান যেসকল হাইটেক পার্ক আছে, এগুলোকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি বায়োটেক পার্ক নির্মাণেরও পরিকল্পনা আমরা করছি।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যারা সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত, আপনারাও সম্প্রতি মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকায় রোডশো আয়োজন করেছেন। বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন, এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য বিষয়।” সরকারপ্রধান বলেন, “আমাদের সামনে নিঃসন্দেহে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ আছে। দক্ষতার ঘাটতি আছে ক্ষেত্রবিশেষে, ল্যাবের সীমাবদ্ধতা আছে; বিনিয়োগেরও হয়তো সীমাবদ্ধতা আছে। “আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতাও রয়েছে। তবে সকল সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেও কিন্তু আমাদের রয়েছে। “তবে আমি এই অনুষ্ঠানে এতোটুকু আমি বলতে চাই, আমার সরকারের অবস্থান থেকে-আপনাদের সেই অদম্য ইচ্ছাকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাধ্য এবং সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে ইনশাল্লাহ বর্তমান সরকার আপনাদের পাশে রয়েছে এবং থাকবে।”

‘মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আজকের এই সামিটে যারা উপস্থিত রয়েছেন, আপনারা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চান, বর্তমান সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেই বাংলাদেশ হবে-স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি মেধাভিত্তিক বাংলাদেশের সম্ভাবনার বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাই।” তিনি বলেন, “বিশ^ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মিলেমিশে চতুর্থ এবং পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি রচনা করেছে। “কমবেশি হয়ত আমাদের একটু ধারণা আছে, বিশেষ করে আমরা যারা এই ফিল্ডে কাজ করি না; আমাদের সামগ্রিকভাবে একটি ধারণা আছে যে, বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টরটা শুধু একটি শিল্পই নয়, এটি একটা সম্ভবত আধুনিক সভ্যতার একটা ভিত্তি। “প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এই সময়ে মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডেটা সেন্টার কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক কলকারখানা কিংবা মহাকাশের স্যাটেলাইট-প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য।” উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টলে ঘুরে দেখেন। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, যুক্তরাষ্ট্রের পারডু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোহাম্মদ মুস্তফা হোসেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন ও বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ জব্বার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ও সিলিকন রিভার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নয়ন, বৈশি^ক প্রযুক্তি নেতৃত্ব, প্রযুক্তির সমন্বয়, উচ্চ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বাংলাদেশের প্রযুক্তিখাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা বিষয়ক ১১টি অধিবেশন এবং ৭টি কৌশলগত আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!