ফিচার

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়ছে জলবায়ু চাপ, ঝুঁকিতে স্থানীয় জ্ঞানব্যবস্থা

ইউনেস্কো-সমর্থিত তরুণদের গবেষণা

জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবক্ষয় ও বন উজাড়, একক ফসলভিত্তিক বাগান সম্প্রসারণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের মতো মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের (সিএইচটি) আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে বলে ইউনেস্কো-সমর্থিত একটি উদ্যোগের আওতায় পরিচালিত তরুণদের গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষণার ফলাফল বলছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক চর্চা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হওয়ায় তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পরিবর্তিত পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রচলিত পরিবেশভিত্তিক জ্ঞান এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, এসব জ্ঞানব্যবস্থা নিজেরাই ক্রমশ নানা ধরনের চাপে পড়ছে।

গবেষণায় সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকও উঠে এসেছে। বিশেষ করে সীমিত সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক কম অংশগ্রহণের কারণে আদিবাসী নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও বেশি বহন করছেন।

এই ফলাফল উঠে এসেছে ইউনেস্কো, মালেয়া ফাউন্ডেশন এবং জাবারাং কল্যাণ সমিতির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত “ইয়ুথ অ্যাজ রিসার্চার্স (ইয়ার): ইন্ডিজেনাস ইয়ুথ অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ” উদ্যোগ থেকে। এই উদ্যোগের আওতায় আদিবাসী তরুণ গবেষকরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অভিযোজন কৌশল নিয়ে কাজ করেন এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত পরিবেশভিত্তিক জ্ঞানকে বৃহত্তর জলবায়ু আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা চালান।

গবেষণার ফলাফল “আদিবাসী তরুণ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন ও মতবিনিময় সভা”-তে উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ এবং চাকমা সার্কেলের প্রধান ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়। এতে নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী, আদিবাসী নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, কমিউনিটির সদস্য এবং তরুণ গবেষকেরা অংশ নেন। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রচলিত পরিবেশভিত্তিক জ্ঞান এবং স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।

এই উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের পাঁচটি তরুণ গবেষণা দল অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি দল মাঠভিত্তিক ও কমিউনিটিকেন্দ্রিক গবেষণার মাধ্যমে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ুজনিত চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করে।

চাকমা দল রাঙামাটিতে তরুণদের নেতৃত্বে জলবায়ু অভিযোজন কৌশল নিয়ে কাজ করেছে। মারমা দল নথিভুক্ত করেছে ঐতিহ্যগত টিকে থাকার পদ্ধতি এবং বর্তমান অভিযোজন চ্যালেঞ্জ। ম্রো দল ‘প্লুং’ নামের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে গবেষণা করেছে। ত্রিপুরা দল প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও তাদের অভিযোজন কৌশল নিয়ে কাজ করেছে। অন্যদিকে তঞ্চঙ্গ্যা দল পাথর উত্তোলন এবং রাবার ও সেগুন বাগান সম্প্রসারণের কারণে সৃষ্ট পানি সংকট নিয়ে গবেষণা করেছে।

সমষ্টিগতভাবে গবেষণাগুলো দেখিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত পরিবর্তন নয়; এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবিকা, সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং জীবনযাত্রার ওপরও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে।

“ইয়ুথ অ্যাজ রিসার্চার্স” উদ্যোগটি ইউনেস্কোর একটি বৈশ্বিক কাঠামোর অংশ, যা বাংলাদেশে আদিবাসী তরুণদের গবেষণা, জলবায়ুবিষয়ক অ্যাডভোকেসি এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততার মাধ্যমে নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনেস্কো, মালেয়া ফাউন্ডেশন এবং জাবারাং কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আদিবাসী ভাষার ব্যবহার ও সংরক্ষণবিষয়ক একটি জাতীয় পরামর্শ সভার মাধ্যমে এই উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। সেই আলোচনায় সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় জ্ঞানব্যবস্থা এবং তরুণদের সম্পৃক্ততার গুরুত্ব উঠে আসে।

পরবর্তীতে ২৫ জন তরুণ অংশগ্রহণকারী গবেষণা পদ্ধতি, নৈতিক বিষয়, তথ্য সংগ্রহ এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক গবেষণা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর কয়েক মাস ধরে নিজ নিজ সম্প্রদায়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও অভিযোজন কৌশল নিয়ে গবেষণাপত্র এবং নীতিপত্র তৈরি করেন।

আগামী দিনে তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা ও জ্ঞান বিনিময়ের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে আদিবাসী তরুণদের জলবায়ু নীতিনির্ধারণে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং সমাধানকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর জলবায়ু উদ্যোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। -প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Back to top button
error: Content is protected !!