স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ৩০, বাড়তে পারে প্রাণহানি

স্পেনের মধ্যাঞ্চলে টলেডো প্রদেশের কাছে দ্রুতগতির দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টার কিছু পর মাদ্রিদ থেকে সেভিলগামী রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। উদ্ধারকারীরা এখনো ট্রেনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলোতে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেননি। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ।
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাখে জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফের ট্রেনে ২৪ জন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইরিওর ট্রেনে ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন সামান্য আঘাত পেয়েছেন, প্রায় ৫০ জনের আঘাতের মাত্রা বিভিন্ন রকম এবং কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চলছে।
আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্র এস্তের পাদিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রেনফের দ্রুতগতির ট্রেনে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন। অন্যদিকে ইরিওর ট্রেনটিতে একটি শিশুসহ ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। সংঘর্ষের পর কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে রেললাইনের পাশের ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসক দল, পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসায় টলেডো, আলকাজার দে সান হুয়ান ও সিউদাদ রিয়ালের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সংকেতের ত্রুটিতে থেমে ছিল একটি ট্রেন
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ইরিও পরিচালিত দ্রুতগতির ট্রেনটি সংকেতের ত্রুটির কারণে রেললাইনে থেমে ছিল। রেল অবকাঠামো ব্যবস্থাপক আদিফের নির্দেশে ট্রেনটি সেখানে দাঁড়িয়েছিল বলে দুর্ঘটনা সম্পর্কে অবহিত একটি সূত্র জানিয়েছে। এ সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রেনফে পরিচালিত আরেকটি দ্রুতগতির ট্রেন পেছন থেকে এসে সেটিকে ধাক্কা দেয়।
স্পেনের রেল অবকাঠামো ব্যবস্থাপক আদিফ জানিয়েছে, মাদ্রিদ-আন্দালুসিয়া উচ্চগতির রেলপথে দুই ট্রেনের সংঘর্ষের পর ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলটি টলেডো প্রদেশের মোরার ও অর্গাজ শহরের মধ্যবর্তী এলাকায়। আঞ্চলিক সরকারের তথ্য অনুযায়ী, উর্দা এলাকার কাছেও দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্তের বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি। রেনফে ও ইরিওর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
‘মনে হচ্ছিল আসন থেকে উড়ে যাচ্ছি’
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন বেঁচে ফেরা যাত্রীরা। ইরিওর ট্রেনে থাকা ফিলিপাইনের পর্যটক ফ্রেডেরিক বারিলেইয়া ও তাঁর স্ত্রী অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। ট্রেনের দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাওয়ায় তাঁদের বাইরে আসতে সহায়তা নিতে হয়নি।
নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ফ্রেডেরিক বলেন, “আমরা ভীষণভাবে হতবাক। মনে হচ্ছিল, আমি আসন থেকে উড়ে যাচ্ছি।” তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের বগিতে কয়েকজন সামান্য আহত হলেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। তবে দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
ইরিওর আরেক যাত্রী এদুয়ার্দা জানান, সংঘর্ষের ধাক্কায় তিনি সামনের দিকে ছিটকে পড়েন এবং তাঁর বগির কয়েকজন যাত্রী আহত হন। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, ট্রেনটি জরুরি প্রয়োজনে থেমেছে। পরে আহতদের দেখতে পান এবং সবাইকে ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নিরাপদ স্থানে যাওয়ার জন্য তাঁকে রেললাইনের পাশের ঢাল বেয়ে নামতে হয়। সেখানে তিনি একটি বগিকে ঢালের ওপর ঝুলে থাকতে এবং অন্য একটি বগিতে আগুন দেখতে পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
অন্য এক যাত্রী মিগেল জানান, ট্রেনের পেছনের দিকে থাকা অবস্থায় তাঁরা হঠাৎ প্রচণ্ড সংঘর্ষের শব্দ শুনতে পান। প্রায় ১০ সেকেন্ড ধরে ধাক্কা চলছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে। জানালা দিয়ে পাশে একটি বিধ্বস্ত ট্রেন দেখতে পান তাঁরা। তাঁর বগির শেষের অন্তত তিনটি অংশ আংশিক কাত হয়ে গিয়েছিল। পরে জানালা ও দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা।
প্যাট্রিসিয়া নামে এক যাত্রী, যিনি নিজেকে অন্তঃসত্ত্বা বলে পরিচয় দিয়েছেন, জানান, জানালা দিয়ে তিনি একটি বগি নিচে পড়ে থাকতে এবং পুরোপুরি পুড়ে যেতে দেখেছেন। তাঁর কথায়, দুর্ঘটনার পর যাত্রীরা অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে একে অপরকে বের হতে সাহায্য করেছেন।
টলেডো প্রদেশের দুর্ঘটনাস্থলের কাছের ছোট শহর লস ইয়েবেনেসের মেয়র হেসুস পেরেস মার্তিন বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর জরুরি সেবার কর্মীরা ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। তাঁর কাছে পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে অত্যন্ত গুরুতর আঘাত ও অঙ্গহানির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় রক্তের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া সাধারণ মানুষকে রক্তদানের আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি নিকটবর্তী রক্তদানকেন্দ্রগুলোর তথ্য দেখে সহায়তা করার অনুরোধ করেন।
দুর্ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও দেখে স্পেন একটি বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নিহতের সংখ্যা ছাড়াও কতজনের নিবিড় পরিচর্যা এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন, তা নিরূপণের চেষ্টা চলছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, টলেডোর কাছে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার খবর তাঁকে মর্মাহত করেছে। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। নিহত ও আহতদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট গার্সিয়া-পাখে বলেন, উদ্ধার ও চিকিৎসার জন্য সব ধরনের জরুরি সেবা ও স্বাস্থ্যসম্পদ কাজে লাগানো হয়েছে। প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর কাছ থেকেও সহায়তার প্রস্তাব পাওয়া গেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলোতে উদ্ধারকারীরা পুরোপুরি পৌঁছাতে না পারায় হতাহতের চূড়ান্ত হিসাব পেতে সময় লাগতে পারে।
একই বছরে দ্বিতীয় বড় ট্রেন দুর্ঘটনা
স্পেনে চলতি বছরের জানুয়ারিতেও দ্রুতগতির দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। একই দুই রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ট্রেন একই রেলপথে ওই দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জানুয়ারির দুর্ঘটনায় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল।
সেই ঘটনার পর দেশটির রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগের পরিমাণ ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। অক্টোবরের এই দুর্ঘটনা রেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নির্বাচনের আগে চাপের মুখে সরকার
ট্রেন দুর্ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন স্পেনে আগামী ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। আবাসন সংকট মোকাবিলায় নেওয়া দুটি সরকারি ডিক্রি পার্লামেন্টে পাস না হওয়া এবং এ নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভের পর প্রধানমন্ত্রী সানচেজ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
বিভিন্ন জনমত জরিপে সানচেজের সোশ্যালিস্ট পার্টি পিছিয়ে রয়েছে। এর আগে জানুয়ারির ট্রেন দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীরা সমালোচনা করেছিলেন। সে সময় পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের পদত্যাগের দাবিও উঠেছিল। নতুন দুর্ঘটনা সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আপাতত উদ্ধারকাজ, আহতদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধানই কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার। দুর্ঘটনার কারণ ও চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা তদন্ত ও উদ্ধার অভিযান এগোনোর পর আরও স্পষ্ট হবে।




