ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহু-আইজেনকটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, আরব দলগুলোর আসন ১৭

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনার আংশিক ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট ও প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। ভোটের ৭৭ শতাংশ গণনা শেষে নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি, আইজেনকটের জোট ৪৯টি এবং আরব দলগুলো ১৭টি আসন পেয়েছে। কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গতকাল বুধবার প্রকাশিত আংশিক ফল অনুযায়ী, ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে বিরোধী শিবিরের ঐক্য এবং আরব দলগুলোর সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য সমঝোতার ওপর। নির্বাচনে প্রায় ৭৮ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের রাজনীতিতে এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের নিয়ে গঠিত জোটের আসন কমেছে। অন্যদিকে উদারপন্থী ইহুদি ভোটার ও আরব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। বিরোধী শিবিরের নেতা আইজেনকট দ্রুত সরকার গঠনের প্রত্যয় জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দ্বিতীয়বার নির্বাচন আয়োজন করা ভুল হবে।
সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ
ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো দল সাধারণত এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠন করতে হয়। এবারের আংশিক ফলেও নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের শিবিরের কেউই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এ অবস্থায় আরব দলগুলোর সমর্থন বিরোধী জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইজেনকট সরকার গঠন করতে চাইলে আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। তারা সরাসরি সরকারে যোগ না দিলেও সংসদে বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে ভোট না দিয়ে সমর্থন দিতে পারে। ইসরায়েলের রাজনীতিতে এ ধরনের ব্যবস্থাকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিকল্প সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে বিরোধী শিবিরের ভেতরেই অনীহা রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধান বামপন্থী দল ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়াইর গোলান বিরোধী দলগুলোকে আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে বিভাজন তৈরির রাজনীতি আর মেনে নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের অংশীদার করে পরিবর্তনের সরকার গঠনের সুযোগ রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটসের আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভও বলেছেন, নির্বাচনের পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। তাঁর দাবি, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন পূর্ণ ডানপন্থী জোট আগের তুলনায় বেশ কিছু আসন হারিয়েছে এবং একই কাঠামোয় সরকার গঠন করতে পারার সম্ভাবনা কমেছে।
কারিভের ভাষ্য, উদারপন্থী ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠী উভয়ের প্রতিনিধিত্ব বিরোধী শিবিরে বেড়েছে। নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্রদের গত চার বছরের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ভোটার অবস্থান নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে বিরোধিতা
আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্যের পর ইসরায়েলে তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। শান্তির পক্ষে কাজ করা ফিলিস্তিনি-ইহুদি আন্দোলন স্ট্যান্ডিং টুগেদার ইহুদিপ্রধান বিরোধী দলগুলোর প্রতি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের আহ্বান জানিয়ে একটি আবেদন শুরু করেছে।
আন্দোলনটির বক্তব্য, পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেওয়া ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠীর সমর্থনকে সরকার গঠনে কাজে লাগানো প্রয়োজন। তাদের মতে, ইসরায়েলের সংসদে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিদের কণ্ঠস্বর ইহুদি প্রতিনিধিদের মতোই সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা।
আন্দোলনটি গাদি আইজেনকট, নাফতালি বেনেট, ইউসেফ জাবারিন, ইয়ার লাপিদ, ইয়াইর গোলান, মনসুর আব্বাস ও আভিগদর লিবারম্যানসহ বিরোধী নেতাদের আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে ডানপন্থী ইসরায়েল ফার্স্ট পার্টির নেতা শারেন হাসকেল আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচের কর্মকাণ্ডের কারণে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে আরব দলগুলোর পক্ষে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
হাসকেল গত জুলাইয়ে ইসরায়েল ফার্স্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিরোধিতা করায় তাদের গ্রেপ্তার স্থগিত রাখার আইন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। তাঁর দল আরব ও অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর বাইরে একটি ইহুদি ঐক্য সরকার গঠনের পক্ষে। এবারের নির্বাচনে দলটি সংসদে আসন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।
লেখক অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইন মনে করেন, আরব দলগুলোর সঙ্গে আইজেনকটের জোট গঠনের সম্ভাবনার পথে ইসরায়েলি সমাজের গভীর আরববিদ্বেষ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আল জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসরায়েলের সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদি ভোটারের একটি বড় অংশ আরব দলগুলোকে কোনো জোট সরকারের অংশ হিসেবে দেখতে চায় না।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা ছাড়ার আহ্বান
আরব দলগুলোর জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর নেতা ইউসেফ জাবারিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারের নীতির কারণে আরব নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
জাবারিন বলেছেন, নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু, বেন-গভির ও স্মোটরিচের সরকারকে বিদায় করার পথ তৈরি করতে প্রস্তুত তাঁর দল। আংশিক ফলাফলে জয়েন্ট লিস্টের আসনসংখ্যা ১৩ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৯ পর্যন্ত হতে পারে বলেও ভোট গণনার আগের একটি পর্যায়ে ধারণা করা হয়।
অন্যদিকে আইজেনকট নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি নেতানিয়াহুকে এমন একজন অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন, যাঁর নতুন করে সরকার পরিচালনার মতো জনসমর্থন নেই।
আইজেনকট বলেছেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাঁর মতে, জনরায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত।
তবে আইজেনকট নিজেও গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ইরানে হামলা হলে বিশ^বাজারে বড় প্রভাবের সতর্কতা
ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলের উদ্যোগে ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে।
আরাঘচির মতে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েলের উসকানিতে কোনো সামরিক অভিযান শুরু হলে তার প্রভাব গ্যাস সরবরাহকারী ও ভোক্তা উভয় পক্ষের ওপর পড়বে। রাশিয়ার মস্কোয় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে অংশ নেওয়ার সময় তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার সম্ভাবনা সামনে এনেছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে নেতানিয়াহু বুধবার বলেছেন, ইরানের কথিত অস্তিত্বগত হুমকি দূর করতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। এ বক্তব্যের পর ইরানের পক্ষ থেকে নতুন হামলার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সতর্কতা আসে।
গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৪ হাজার ৫৬৪
ইসরায়েলের নির্বাচনের পাশাপাশি গাজায় নতুন হামলা ও হতাহতের খবরও এসেছে। গাজার হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার হিসাবে অন্তত তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১১ জন।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন করে ইসরায়েলি হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। আগে আহত হওয়া আরও দুজন পরে মারা গেছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৫৬৪ জনে। আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭০ জন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬৮ জনে। এ সময়ে আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৯ জন।
নির্বাচনের ফলেও বদলাবে না ফ্রান্সের অবস্থান
ইসরায়েলের নির্বাচনে যে পক্ষই সরকার গঠন করুক, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে ফ্রান্সের অবস্থান বদলাবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো।
তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর জোট কিংবা আইজেনকটের বিরোধী জোট, যে পক্ষই জয়ী হোক না কেন, ফ্রান্সের নীতি অপরিবর্তিত থাকবে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাশাপাশি দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করতে চায় প্যারিস।
২০২৫ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। সম্প্রতি মাখোঁ অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার ঘোষণাও দিয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলের নির্বাচনের আংশিক ফল প্রকাশের পর দেশটির মুদ্রা শেকেলের দর মার্কিন ডলারের বিপরীতে কমেছে। সকালের লেনদেনে ডলারের বিপরীতে শেকেলের দর ০ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে প্রতি ডলারে ৩ দশমিক ০৭৭ শেকেলে দাঁড়ায়।
ভোটের ফল চূড়ান্ত হওয়ার আগে সরকার গঠনের সমীকরণ অনিশ্চিত থাকায় ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর ভূমিকা, বিরোধী জোটের অবস্থান এবং নেতানিয়াহুর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন পর্যবেক্ষকেরা।




