জাতীয়প্রধান খবর

থমকে আছে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা হলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রায় এক দশক ধরে কক্সবাজার ও আশেপাশের এলাকায় ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রতিশ্রুতি আসছে, জাতিসংঘ মহাসচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বারবার প্রত্যাবাসনের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। এ কারণে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট এখন স্থবির অবস্থায় রয়েছে এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের পর বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তখন থেকেই আন্তর্জাতিক মহল রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কথা বলছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত বছর উখিয়ার ক্যাম্প পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় এবং ক্যাম্পেও ভালো পরিবেশ চায়। বিশ্ববাসীকে তিনি এই বার্তা দিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার আহ্বান জানান। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তার আশ্বাসও দেওয়া হয়। সে সময় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল, খুব দ্রুত শুরু হবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের সহযোগিতা না পাওয়ায় কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং নতুন করে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে আর কোনো রোহিঙ্গা আশ্রয় না দেওয়ার নীতিগত অবস্থান ঘোষণা করলেও বাস্তবে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ থামানো যাচ্ছে না। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের তথ্যমতে, গত মে পর্যন্ত মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল থেকে এক বছরে নতুন করে আরও ১ লাখ ১৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ জন রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ফলে প্রত্যাবাসনের চেয়ে অনুপ্রবেশ ঠেকানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের অবস্থান তাদের জীবিকা, পরিবেশ ও নিরাপত্তায় চাপ সৃষ্টি করছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও সম্প্রতি বলেছেন, সমস্যার শুরু মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানেই। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে শিবিরে অবস্থান কোনো সমাধান নয়, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তাই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তিনি আরও বলেন, শিবিরে প্রযুক্তি-সুবিধা পাওয়া এক হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম বড় হয়ে উঠছে, যা কারো জন্যই ভালো খবর নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাখাইনে এখন ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। খাবার ও ওষুধ না পেয়ে লোকজন বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির দখলে রাখাইন। তারা সেখানকার সরকারি বাহিনীকে উৎখাত করে বেশিরভাগ এলাকা দখলে নিয়েছে। রাচিডং-বুচিডং শহরের অন্তত ২ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাস্তুহারা। মংডু টাউনও তাদের দখলে। সব মিলিয়ে সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। এ অবস্থায় বাংলাদেশের আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরা আরও অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনুপ্রবেশ ঠেকানো। প্রত্যাবাসনের কোনো অগ্রগতি নেই, বরং নতুন করে অনুপ্রবেশ বাড়ছে। এটা অনেকটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপও। সরকার বলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে খরচ বাড়ছে এবং এই চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি। ইউএনএইচসিআর ও বিশ্বব্যাংকের কাছে সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। আসছে সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে রোহিঙ্গা বিষয়ে আয়োজিতব্য উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকার বাস্তবমুখী এবং সময়াবদ্ধ সমাধান খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্বারোপ করবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে রাজি করানো এবং রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মিয়ানমার, চীন ও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো অগ্রগতি নেই। বরং নতুন করে অনুপ্রবেশ বাড়ছে, রাখাইনে মানবিক সংকট তীব্র হচ্ছে এবং শিবিরে তরুণ প্রজন্ম হতাশ হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এটি এখন বহুমাত্রিক সংকট- মানবিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!