হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে একজন করে ও রংপুরে ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য-
ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় জনে। গতকাল শুক্রবার সকালে হাসপাতালে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। মৃত শিশুটির বয়স চার। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদরে। শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইনউদ্দীন খান জানান, শিশুটি হাম আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও নিউমোনিয়া ও হার্টের সমস্যায় ভুগছিল। তিনি আরও জানান, বর্তমানে হাসপাতালে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৬৭ জন শিশু ভর্তি থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে।
রাজশাহী: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে সংক্রামক রোগ হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এই একজনের মৃত্যু হয়েছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করেন। ডা. শংকর কুমার জানান, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ১২ জন। আর ছাড়পত্র পেয়েছে ১৩ জন। এখন হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট ৩৫২ জন রোগী ভর্তি আছে।
রংপুর: রংপুর বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে বিভাগজুড়ে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দেড়শ ছাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার হামের উপসর্গ নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১০ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। শতাধিক শিশু নিউমোনিয়া শ্বাস কষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ৮ জেলায় হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দেড়শ’ ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোবার থেকে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য শিশু ওয়ার্ডের পাশে একটি ছোট কক্ষে মাত্র ৬টি বেডে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জায়গা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে। এমনকি একজন শিশুকে মেঝেতে আর তিন শিশুকে বাইরে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের ৯ ও ১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্ট, সর্দি, জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। বেড সংকটের কারণে একটি বেডে ২ থেকে ৩ জন শিশুকে রাখতে হচ্ছে। নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ৯ মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে আসা আজমেরী বেগম জানান, একটা বেডে দুই শিশুকে একসঙ্গে রাখতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তারা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মায়েদের দাঁড়িয়ে বা মেঝেতে বসে থাকতে হচ্ছে। একই কথা জানালেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর মাসুমা বেগমসহ অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে একটি আইসলেশন ওয়ার্ড স্থাপনের দাবি জানান তারা। এদিকে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে দুই জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে শরীরে র্যাশ না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত করা কঠিন। তবে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে উচ্চ জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্টসহ হামের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আইসোলেশন ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. খালিদ জানান, গত ২ বছর ধরে নিয়মিত হাম টিকাদান না হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই ৫ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে বয়সী শিশু। রংপুরের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কামরুজ্জামান তাজ জানান, এ পর্যন্ত ১৫ জন শিশুর রক্ত পরীক্ষা করে ৭ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, শিশুদের জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্ট ও র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা জরুরি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে জরুরি বিভাগে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মশিউর রহমান। এ নিয়ে জেলায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ জনে। এর মধ্যে জেলা হাসপাতালে ৫ জন এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা ২ জন রয়েছেন। তিনি জানান, সকালে শিশুটি জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত অবস্থায় পান। মৃত শিশু সদর উপজেলার শাজাহানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামের নৈমুর রহমানের আড়াই বছরের কন্যা মাসুদা খাতুন। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে ভর্তির আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়। তবে শিশুটি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে নাকি অন্য কোনো জটিলতায় মারা গেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পোস্টমর্টেম ও নমুনা পরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১২ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ২৪ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৪৬ জন। এ নিয়ে জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯ জন। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আব্দুস সামাদ জানান, বর্তমানে হাম পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত দুই দিন ধরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছে। একই সঙ্গে সুস্থতার হারও বেড়েছে।
টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। এ নিয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ২ জনের মৃত্যু হলো। নিহত শিশু টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ধোলোটিয়া গ্রামের সাদ্দামের ছেলে সাফার বয়স এক বছর এক মাস। হাসপাতাল সূত্র জানা যায়, গত ২২ মার্চ সাফা হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়। পরে গতকাল শুক্রবার ভোরে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ২৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল সূত্র জানায়, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে টাঙ্গাইলে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। এদের বয়স আড়াই মাস থেকে ১২ মাস পর্যন্ত। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক খন্দকার সাদিকুর রহমান বলেন, ভোরে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও হামের চিকিৎসা দিতে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।




