সারাদেশ

পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বুঝে নিল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, শুরু হলো একক পথচলা

একীভূত হওয়া পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেওয়ার মধ্য দিয়ে গতকাল রোববার থেকে এককভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। সর্বশেষ গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক প্রত্যাহারের পর পাঁচ ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নতুন ব্যাংকটির হাতে হস্তান্তর করা হয়। তবে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একীভূত হলেও পাঁচ ব্যাংক এখনো নিজ নিজ নামে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পরবর্তী ধাপে তাদের প্রযুক্তিগত বা আইটি ব্যবস্থা একীভূত করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “পাঁচ ব্যাংকই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব ব্যাংক এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে চলে যাওয়ায় গতকাল রোববার থেকে এককভাবে পথচলা শুরু করেছে।” এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আর্থিক সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পাঁচ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত আসে গত ২০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ক্রমে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। এরপর একে একে ব্যাংকগুলো থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত প্রশাসক ও তাঁদের দল প্রত্যাহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় গত ৩০ জুলাই এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রশাসক ও তাঁর দল প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে গত ১৬ জুলাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন আবেদুর রহমান সিকদার। সর্বশেষ গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে প্রশাসক প্রত্যাহারের মাধ্যমে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণই নতুন ব্যাংকটির হাতে চলে আসে। প্রশাসকদের প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্বেরও অবসান হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি অব্যাহত থাকবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক আর সরাসরি পাঁচ ব্যাংকের ব্যবসায়িক পরিচালনায় থাকবে না। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে পূর্ণ তদারকিতে রাখবে। আমরা দ্রুত জ্যেষ্ঠ পদগুলোতে ৪-৫ জন নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেব। আপাতত এমডি মহোদয় পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রম দেখছেন এবং যেখানে প্রয়োজন ছুটে যাচ্ছেন। পাশাপাশি পুরোনো কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।” পাঁচ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান ও মহাখালী এলাকায় ছড়িয়ে থাকায় নতুন এমডির জন্য একসঙ্গে সব ব্যাংকের কার্যক্রম দেখভাল করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে শুধু এক্সিম ব্যাংকে একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ডিএমডি রয়েছেন। অন্য ব্যাংকগুলোতে এ পর্যায়ের নির্বাহী পদে শূন্যতা রয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জানান, একীভূতকরণ কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের লক্ষ্য আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে পাঁচ ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি একক ও শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে রূপান্তর করা।” তবে গতকাল রোববার থেকে নিয়ন্ত্রণ একীভূত হলেও পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং একীভূতকরণ এখনো শেষ হয়নি। পাঁচ ব্যাংকের শাখা ও অন্যান্য সেবা কাঠামো বিদ্যমান নামেই চলছে। পরবর্তী ধাপে পাঁচ ব্যাংকের আইটি ব্যবস্থা এক প্ল্যাটফর্মে আনার কাজ হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে পৃথক পাঁচ ব্যাংকের পরিবর্তে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে সমন্বিত ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের দেশজুড়ে বড় একটি সেবা নেটওয়ার্কও নতুন ব্যাংকটির অধীনে এসেছে। পাঁচ ব্যাংক মিলিয়ে রয়েছে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ। তবে বড় এই নেটওয়ার্কের পাশাপাশি বিপুল খেলাপি ঋণের দায়ও নতুন ব্যাংকটির ওপর পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। তাদের মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশই ছিল খেলাপি। পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর প্রতিটি ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে এসব ব্যাংকের সম্পদ ও দায় নতুন ব্যাংকের আওতায় আনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ করতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একীভূত করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রমকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটি যেহেতু শুরু হয়েছে, সেহেতু এটি যেকোনো উপায়েই হোক সফলভাবে শেষ করতে হবে। নতুন চেয়ারম্যান ও এমডিকে দায়িত্ব দিয়ে দ্রুত শীর্ষ পর্যায়ে যোগ্য জনবল নিয়োগ দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন রূপান্তর প্রক্রিয়াটি লাইনচ্যুত না হয় এবং কেউ বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগ না পায়।” খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ণাঙ্গ একীভূতকরণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে কঠোর ও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। দীর্ঘ প্রক্রিয়াটি সফলভাবে শেষ করতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রযুক্তি, জনবল ও ব্যাংকিং কার্যক্রমের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!