সারাদেশপ্রধান খবর

উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন আসলো কফিনবন্দি হয়ে

দাদা-দাদির কবরের পাশে শায়িত হলেন যুক্তরাষ্ট্রে হত্যার শিকার লিমন

খাদেমুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক:
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের লালডোবা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে লিমনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
সোমবার সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে জামিল আহমেদ লিমনের নিথর দেহ বহনকারী একটি ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে লিমনের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে তার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের লালডোবা গ্রামে আনা হয়। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে লিমনের মরদেহ তার গ্রামের বাড়িতে এসে পৌছালে হৃদয়বিদারক অবস্থা তৈরি হয়। কফিনবন্দি লিমনকে একজন নজর দেখতে উপচে পড়ে মানুষের ভীড়। বাদ মাগরিব লালডোবা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে লিমনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

লিমনের জানায় বাবা জহুরুল হক, ভাই জুবায়ের আহমেদ, জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জামালপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একেএম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ, উপজেলা নির্বাহী কমকর্তা সুমন চৌধুরী, এনসিপির যুগ্ম সচিব লুৎফর রহমান ছাড়াও লিমনের আত্মীয় স্বজন এবং গ্রামবাসীরা উপস্থিত ছিলেন। জানাজায় ইমামতি করেন নিহত লিমনের ফুফাতো ভাই হাফেজ মাওলানা সাইদুর রহমান। জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে লিমনকে শায়িত করা হয়।

লিমনের বাবা জহুরুল হক বলেন, আমার ছেলে লিমন পিএইচডির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল এবং সেখানে তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছি। যেন বিদেশে পড়তে গিয়ে আর যেন কেউ এভাবে প্রাণ না হারায়।

তিনি আরও বলেন, আমার সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে আমি নিজে অনেক কষ্ট করে ছেলে দুটোকে বড় করেছি। কোনদিন তাদের শারীরিক আঘাত করিনি। যা শাসন করেছি মুখে শাসন করেছি। আমার ছেলেকে এইভাবে মরতে হবে, কখনও ভাবতেই পারিনি। উপরওয়ালা জানেন ছেলেটাকে কি কষ্ট দিয়ে মেরেছে।
লিমনের চাচা জিয়াউল হক জানান, লিমন খুবই শান্তশিষ্ট ভদ্র ছেলে ছিল। সে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল এবং সেখানেই তাকে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারে শোকের মাতম চলছে। সকালে লিমনের লাশ ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছে। সেখান থেকে তার লাশ গ্রামে আনা হয়। মাগরিব নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসাইন জানান, লিমন আমাদের গর্ব ছিল। তাকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তিনি বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একই দাবি জানান স্থানীয় বাসিন্দা খুরশেদ আলম, নুর নবী, সুজন আহম্মেদসহ অন্যরাও।

জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, লিমনের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থী এমন নৃশংস হত্যার শিকার হওয়া আমাদের জন্য শুধু দু:খজনকই নয়, আমাদের দেশ, সরকার, জামালপুর তথা তার পরিবার যে ক্ষতির শিকার হয়েছে, তা অপূরনীয়। লিমনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করে লিমনের মৃতদেহ উদ্ধার এবং দেশের আনার ব্যাপারে তৎপর ছিলো এবং সেখানে আরো একটি মেধাবী শিক্ষার্থী বৃষ্টি সেও হত্যার শিকার হয়েছে, আমাদের সরকার তারও মৃতদেহ দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের আনার জন্য তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে এবং তাদের বিচার ব্যাবস্থায়ে স্বচ্ছতা রয়েছে, তারপরও আমারা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রাখছি, যাদের যে অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে এবং তার সাথে আরো কেউ জড়িত রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে শাস্তি নিশ্চিত করা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, লিমনের বাবা জহুরুল হক ১৯৯৪ সালে পরিবারসহ ঢাকায় চলে যান এবং সেখানেই বসবাস করতেন। তিনি একটি টেক্সটাইল কারখানায় চাকরি করেন। মাঝে মধ্যে তারা গ্রামের বাড়িতে আসতেন। লিমন ২০১৪ সালে গাজীপুরের মাওনা মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পিএইচডি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভর্তি হন। গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে জামিল আহমেদ লিমন(২৭) ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি(২৭) নিখোঁজ হন। পরদিন তাদের এক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। পরে ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে লিমনের লাশ উদ্ধার করা হয়। সেই ব্রিজের আশপাশে ডুবুরি দলের অনুসন্ধানের পর তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। লিমন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতিমালা বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। এ হত্যাকান্ডে জড়িত সন্দেহে লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুগারবিয়েহকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!