এক বছরের মধ্যে ৫০টি বন্ধ কারখানা চালুর ঘোষণা বাণিজ্যমন্ত্রীর

আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। চামড়া পচন রোধে সরকারি খরচে দেশব্যাপী বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করা হবে। এছাড়াও আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের বন্ধ হয়ে থাকা ৫০টি পাট ও বস্ত্রকল পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালু করা হবে। পাশাপাশি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) আওতা ও সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে। গতকাল সোমবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব কথা জানান। চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে লবণ ও ৭ দিন ঢাকায় পরিবহন বন্ধ: ঈদে কোরবানির চামড়া সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী কোরবানির ঈদে আমাদের একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য জেলা প্রশাসকদের কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট এলাকার মসজিদ-মাদ্রাসার মুহতামিম ও ইমামদের ডেকে চামড়া সংরক্ষণের ওপর দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সরকার বিসিকের মাধ্যমে নিজস্ব খরচে প্রতিটি জায়গায় লবণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবে। যথাযথ মূল্যের অভাবে ক্ষোভের বশে চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, মানুষ মূলত দাম না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে চামড়া ফেলে দেয়। কারণ, চামড়া পচে গেলে তার আর কোনও মূল্য থাকে না। তাই পচন রোধে প্রিজারভেটিভ হিসেবে সরকারি খরচে লবণ মাখানোর ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি রেডিও-টেলিভিশনে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হবে। ঢাকায় চামড়ার চাপ কমানোর বিষয়ে মন্ত্রী জানান, কোরবানির পর প্রথম ৭ দিন ট্রাকে করে কোনও চামড়া ঢাকায় আনা যাবে না। কারণ, একসঙ্গে সব চামড়া ঢাকায় চলে এলে বর্তমান পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। তৃণমূল পর্যায়ে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হবে, যাতে একটি চামড়াও নষ্ট না হয়।
৫০টি বন্ধ কারখানা চালুর ঘোষণা: বন্ধ কলকারখানা চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সকালে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে পাট ও বস্ত্রকলের অধীন থাকা ৫০টি (২৫টি পাট ও ২৫টি বস্ত্র) মিল চালুর অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন। আমরা তাঁকে বিস্তারিত জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, পাট ও বস্ত্র খাতের অনেকগুলো মিল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এই ৫০টি মিল চালুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এতে বিশাল কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ তৈরি হবে। চলতি বছরের মধ্যেই আরও ৬টি মিল নতুন করে চালু করা হবে।
বাড়ছে টিসিবির আওতা, গঠিত হবে উপদেষ্টা পরিষদ: টিসিবির সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা টিসিবির আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সংস্থাটির কাজের সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে একটি নলেজ সোর্স (জ্ঞানের উৎস) তৈরি করা হবে। টিসিবির নীতিগত বিষয়গুলোতে (পলিসি ম্যাটার) আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য আগামীতে একটি কার্যকর উপদেষ্টা পরিষদ (ফাংশনাল অ্যাডভাইজারি কাউন্সিল) গঠন করা হবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণে ডিসিদের সহায়তা কামনা: বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সহায়তা চেয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকদের কাছে আমরা একটি জিনিস চেয়েছি, তা হলো আগামী দিনে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য তারা যেন নজরদারি বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখেন। প্রশাসন ও নির্বাচিত সরকার উভয়ে সমন্বিতভাবে এসব পদক্ষেপের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে কীভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ডিসিরা কোনো সমস্যা অনুভব করেন কি না বা এ জাতীয় কোনো সমস্যার কথা জানিয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বাজারের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় তো আছেই। যেমন- উৎপাদক পর্যায়ের মূল্য এবং খুচরা বাজারের মূল্যের মধ্যে, বিশেষ করে কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে, বড় একটা গ্যাপ (পার্থক্য) থাকে। আরেকটি বিষয় হলো, এই বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য গত ৫০-৫৫ বছরে কোনো সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি। তিনি আরও বলেন, আমরাই এই সরকারে প্রথম উদ্যোগ নিচ্ছি, যাতে আমদানি পর্যায় থেকে শুরু করে একদম খুচরা পর্যায়ে বিক্রয় পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনটিকে (সরবরাহ ব্যবস্থা) একটি এআই জেনারেটেড মডেলের অধীনে নিয়ে আসা যায়। এমন একটি মডেল তৈরি করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে আমরা সারাক্ষণ বাজার পর্যবেক্ষণ করতে পারব। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যেসব পণ্যের জন্য আমরা আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব পণ্যের একটি স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ (কৌশলগত মজুত) তৈরি করার প্রকল্প আমরা নিতে যাচ্ছি। বর্তমানে আমাদের পর্যাপ্ত স্টোরেজ বা সংরক্ষণের সুবিধা নেই। আমরা এমন ব্যবস্থা করতে চাই, যাতে গুটি কয়েক লোকের ওপর আমাদের নির্ভর করতে না হয়। সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমি শুধু সিন্ডিকেটের কথা বলছি না, সবকিছু যে সিন্ডিকেটের কারণে হয়, তাও নয়। বাজার ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যের কারণেও অনেক সময় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি (সংরক্ষণাগার) নির্মাণ, স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ তৈরি এবং একটি সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মতো আমাদের আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে ডিসিদের সংক্ষেপে ধারণা দিয়েছি।




