সারাদেশ

১৪ হাজার সহকারী শিক্ষকের দ্রুত পদায়ন না হলে রাজপথে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে ২০২৫ ব্যাচে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয় ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের প্রায় পাঁচ মাসেও পদায়ন হয়নি। দ্রুত পদায়ন করা না হলে রাজপথে আন্দোলন করবেন তারা। তবে এই পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় সে লক্ষে পদায়নে দীর্ঘসূত্রিতায় দুর্ভোগ, অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে উদ্ধার পেতে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীর পক্ষে দেবব্রত সরকার, ফারজানা আক্তার ও জান্নাতুল ইসলাম টনি বিভিন্ন তাদের দাবি তুলে ধরেন। এ সময় সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আমাদের মধ্যে অনেকেই আগের সরকারি ও বেসরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে আরও ভালো বেতনের চাকরিতে যোগদান করেননি। কারণ শিক্ষকতাকে তারা শুধু চাকরি হিসেবে নয়, বরং স্বপ্নের পেশা এবং জাতি গঠনের এক মহান দায়িত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সেই স্বপ্নের চাকরিতে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও আজ আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরমে আগের চাকরি থেকে অব্যাহতির তথ্য দেওয়ার প্রয়োজনে অনেকেই আগেই চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলে অসংখ্য পরিবার আজ আয়-রোজগারহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রয়েছেন। চাকরিতে যোগদানের এই দীর্ঘ বিলম্ব আমাদের সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমরা প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষক প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার পরিবার। চূড়ান্ত সুপারিশের সংবাদে যে পরিবারগুলো আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিল, আজ তারা উল্টো সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখী। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন প্রশ্ন করেন, আসলেই কি চাকরি হয়েছে, নাকি এটি শুধুই কাগজে-কলমে? সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ইতিহাসে চূড়ান্ত সুপারিশের পর বিদ্যালয়ে পদায়নের জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষার নজির নেই। বিগত নিয়োগগুলোতে সুপারিশের পর দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছিল। অথচ আমরা আজও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছি। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নীলফামারী জেলার একজন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক সম্প্রতি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তার বাবা নেই, তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। বর্তমানে তার পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ এবং তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছেন। আমাদের প্রশ্ন, একজন মানুষের জীবনে যখন এমন বিপর্যয় নেমে আসে, এর দায়ভার কে নেবে? সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, এবারের নিয়োগে প্রায় ৯ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখান থেকে মাত্র ১৪ হাজার ৩৮৪ জন চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এটি একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, স্বচ্ছ ও মেধাতান্ত্রিক একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া। আমাদের মধ্যে অধিকাংশাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। নিয়োগের আগে প্রশিক্ষণ করানো হবে এমন তথ্য জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যদি কোনো কারণে প্রশিক্ষণে কাউকে অকৃতকার্য ঘোষণা করা হয়, তাহলে এতদিন কোন আশায় অপেক্ষা করলেন সেই প্রার্থী? যারা চাকরি ছেড়ে এসেছেন, তাদের ভবিষ্যতের দায়ভার কে নেবে? আমাদের মধ্যে অনেক নারী সহকারী শিক্ষক রয়েছেন যারা বর্তমানে গর্ভবতী অথবা সম্প্রতি সন্তান জন্ম দিয়েছেন। পদায়নের আগেই দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এসব মায়েদের জন্য কী ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে? সে বিষয়ে এখন সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বর্তমানে তীব্র শিক্ষক সংকটে ভুগছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার বলা হয়েছে যে বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত শিক্ষক প্রয়োজন। তাহলে এই সংকটের সময় নিয়োগ কার্যক্রমকে আরও দীর্ঘায়িত করার যৌক্তিকতা কোথায়? আমরা এনএসআইয়ের রিপোর্ট বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই। অতীতের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর আলাদাভাবে এনএসআই এর রিপোএর্টর কোনো নজির দেখা যায়নি। পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা এখন নতুন করে এসএসআইয়ের রিপোর্ট যুক্ত করার কারণ কী? আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা রাস্তায় নামতে চাই না। আমরা শিক্ষক। আমাদের দাবি রাজপথে নয়, শ্রেণিকক্ষে। আমরা আন্দোলন নয়, পাঠদান করতে চাই। আমরা শিক্ষার্থীদের মাঝে থাকতে চাই। কিন্তু চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈষম্য, বিধিমালা বহির্ভূত সিদ্ধান্ত বা অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হলে তা কেউ সহজভাবে মেনে নেবে না। দীর্ঘ পাঁচ মাসের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আমাদের মধ্যে ইতোমধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত বিদ্যালয়ে পদায়ন নিশ্চিত করা হলে এই অসন্তোষ দূর হবে। কিন্তু এর পরিবর্তে যদি নতুন কোনো অনিশ্চয়তা, বৈষম্য বা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সেই অসন্তোষ আরও গভীর ক্ষোভের রূপ নিতে পারে। আমরা চাই না পরিস্থিতি সেদিকে যাক। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। আমরা চাই সরকারও আমাদের সহযোগিতা করুক। আমরা বিশ্বাস করি, এই সমস্যার সমাধান এবং নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সদয় দৃষ্টি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আজ সাড়ে ১৪ হাজার পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা তার সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!