ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৯২০, ধ্বংসস্তূপে আটকা আরও শতাধিক
উদ্ধারকাজে আন্তর্জাতিক সহায়তা

ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন তিন হাজার ৩৬০ জন। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকা থাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে জোরেশোরে। রাজধানী কারাকাসসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সময় গত বুধবার বিকেলে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে একই এলাকায় অনুভূত হয় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। জোড়া এই কম্পনে লা গুয়াইরা, কারাকাস এবং আশপাশের কয়েকটি শহরে শত শত ভবন ধসে পড়ে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ায় অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেস জানান, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো অন্তত ১৭২ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন। তিনি বলেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঞ্চল থেকে এ পর্যন্ত ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস জানান, উদ্ধারকর্মীরা কয়েক ডজন মানুষকে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। টেলিভিশনে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “কয়েক ডজন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তারা যে আবারও প্রিয়জনদের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছেন, এটাই আমাদের বড় আনন্দ।” তিনি আরও জানান, জোড়া ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত ২১৪টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
বিবিসি জানিয়েছে, লা গুয়াইরার একটি শপিং মল ধসে পড়ার পর সেখানে কর্মরত নিজের দুই মেয়ের খোঁজে ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করছেন নাতাশা দিয়াজ। ২২ ও ২৩ বছর বয়সী দুই মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “ওরা বন্ধুদের সঙ্গেই ছিল। আমি শুধু ওদের ফিরে পেতে চাই। আমার বিশ^াস ওরা বেঁচে আছে। ওরা ছাড়া আমার আর কেউ নেই।”
উদ্ধারকাজের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছে। অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীদের খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরাতে দেখা গেছে। ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় জীবিতদের উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ধসে পড়া ভবনের সামনে স্বজনদের অপেক্ষা আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
চিকিৎসকরাও সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। চিকিৎসক পেড্রো হাভিয়ের ফার্নান্দেজ বলেন, দুর্যোগের আগেই ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিতে ভুগছিল। ফলে এত বড় বিপর্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রয়টার্স জানায়, আন্তর্জাতিক সহায়তা ইতোমধ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষ উদ্ধারকারী দল মাঠে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণার পাশাপাশি ২৫০ সদস্যের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম।
জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ভূমিকম্পের আগেই ভেনেজুয়েলার লাখো মানুষ মানবিক সংকটে ছিলেন। আর নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান জান এগেল্যান্ডের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও অবকাঠামোর দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু আশার খবর মিলছে। বিবিসি জানিয়েছে, লা গুয়াইরায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন ভাইবোনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীদের এমন সাফল্য নতুন করে আশা জাগাচ্ছে স্বজন হারানোর শঙ্কায় অপেক্ষায় থাকা হাজারো পরিবারের মধ্যে।




