প্রধান খবরসারাদেশ

লোডশেডিংয়ে ‘জনরোষ বাড়ছে’, ৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং প্রেক্ষিতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের তথ্য তুলে ধরে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দিয়েছে। এসব সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশের মহাপরিদর্শক-আইজিপিকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিটি বুধবার পুলিশের মহাপরিদর্শক-আইজিপির কাছে পাঠানো হয়। পল্লী বিদ্যুতের একজন কর্মকর্তা এফএনএসকে চিঠিটি পাঠানোর কথা বলেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বিকালে বলেন, “আমরা কিছুক্ষণ আগে চিঠি পেয়েছি। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।” পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি সংকট ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। ফলে সরবরাহ কমেছে। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রামাঞ্চলে অতিরিক্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে এসব এলাকায় ‘জনরোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে’। কিছু এলাকায় বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ও কার্যালয় হামলার শিকার হচ্ছে বলেও চিঠিতে বলা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, দেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ বা প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের যে বরাদ্দ তারা পায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করে। গত কয়েক দিনে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সম্মিলিত গড় চাহিদা ছিল প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা এমনকি ১২ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে। চিঠিতে বলা হয়, “দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর করছে। এতে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে রয়েছেন।” এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে আইজিপিকে। চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, বিদ্যুৎ সচিবের একান্ত সচিব এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবকে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ও জেনারেল ম্যানেজার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ওসিদের কাছেও অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। চলমান বিদ্যুৎ সংকটের জন্য গ্যাসের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া গেলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নতুন একটি কৌশলে কাজ শুরু করার কথাও জানান তিনি। “আমরা একটা কৌশল নিয়েছি। আমরা সেই কৌশলটা গতকাল সন্ধ্যা থেকে নিয়েছি। আমরা আশা করছি আজকে সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে, ইনশাল্লাহ।” সাম্প্রতিক গ্যাস ঘাটতির মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগরের বৈরী পরিস্থিতির কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন এলএনজি খালাস করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর এক্সেলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালও এখনও পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। “এক্সেলারেট টার্মিনাল থেকে আমরা এখনো ফুল ক্যাপাসিটিতে কাজ করতে পারছি না। দেশি উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব না। এটা আপনারা জানেন। একটা দীর্ঘমেয়াদি একটা ব্যাপার।” গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে মালয়েশিয়ার সঙ্গেও সরকার আলোচনা করছে, বলেন প্রতিমন্ত্রী অমিত। মালয়েশিয়ায় চিঠি পাঠানোর পর তিনি ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী দেশটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। পরে বাংলাদেশের একটি দল মালয়েশিয়ায় যায়। “তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অফার নিয়ে আমরা কাজ করছি। তার ধারাবাহিকতায় তাদের কাছ থেকে আমরা আশা করছি অ্যাটলিস্ট এক কার্গো এলএনজি আমরা পাব।” আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে। তবে এ ধরনের বিশেষ ট্যাংক সহজে পাওয়া যায় না বলে এটিকে তাৎক্ষণিক নয়, মধ্যমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সামাল দিতে সরকার বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নিচ্ছে এবং হাতে থাকা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছে। “আমাদের হাতে যতগুলো বিকল্প ছিল আমরা সকল বিকল্প নিয়ে কাজ করছি।” আগের সরকারগুলোর জ্বালানি নীতির সমালোচনাও করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তার দাবি, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমান সংকটের ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। “দেখেন, যখন ভুল নীতি আপনি গ্রহণ করবেন একটি সময় তার মাসুল দিতে হবে।” তবে বিদ্যুৎ অফিসের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ওই চিঠি দেয়নি। “আমরা দেইনি। আপনি আমার কাছে যদি বলেন, আমি মন্ত্রণালয়কে রিপ্রেজেন্ট করছি।”

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!