সারাদেশ

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি স্টিল শিল্প মালিকদের

বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের স্টিল শিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছে ‘বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)’। অবিলম্বে বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করে আগের ট্যারিফ পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান সংগঠনটির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিএসএমএর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, দেশের স্টিল শিল্প বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। নির্মাণখাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা, কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি, গ্যাস সরবরাহ সংকট এবং পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি শিল্পখাতকে চরম চাপে ফেলেছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল ও ১৫০টির বেশি রি-রোলিং মিল রয়েছে, যাদের সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ দশমিক ২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অথচ দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় অধিকাংশ কারখানা তাদের সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফের কারণে প্রতি মেট্রিক টন স্টিল উৎপাদনে ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৭৮৫ টাকা বাড়বে। ভ্যাট, বন্দর চার্জ, জ্বালানি, পরিবহন ব্যয়, ফেরো-অ্যালয় ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে অতিরিক্ত ব্যয় প্রতি টনে প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। বিএসএমএ জানায়, দেশের বৃহৎ স্টিল কারখানাগুলো ৩৩, ১৩২ ও ২৩০ কেভি উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের সরাসরি গ্রাহক। এসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। ফলে তাদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সিস্টেম, ট্রান্সমিশন বা ডিস্ট্রিবিউশন লস নেই। তারপরও ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ, ভ্যাটসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পুরোটা ভোক্তাদের ওপর চাপানো সম্ভব নয়। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ নিজেদের বহন করতে হবে। অন্যদিকে স্টিলের দাম বাড়লে আবাসন, অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতেও এর প্রভাব পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের। তিনি আরও বলেন, দেশের মোট স্টিল ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে স্টিলের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয়ও বাড়বে, যা জাতীয় উন্নয়ন ব্যয়কে আরও বৃদ্ধি করবে। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায় উৎপাদনশীল শিল্পখাতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। এতে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে এবং দেশের শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হবে। এক লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগসমৃদ্ধ স্টিল শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাত। এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে আগের মূল্যহার পুনর্বহাল করা জরুরি। এ সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ড. সুমন চৌধুরী, ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ, সাবেক প্রেসিডেন্ট মানোয়ার হোসেন, বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট মারুফ মহসীন, রেজাউল করিম, জয়েন্ট সেক্রেটারি জাকারিয়া জাকি, কেএসআরএমের উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) আশফাকুল ইসলাম, বিএসআরএমের হেড অব মার্কেটিং কাজী আনোয়ার আহমেদ প্রমুখ।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!