তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতাগুলো দূর করার তাগিদ

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাক করের কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হলেও সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, তামাক সেবন হ্রাস, যুবসমাজকে ধূমপান থেকে দূরে রাখা এবং সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান তামাক কর কাঠামোর দুর্বলতাগুলো দূর করা প্রয়োজন। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘বাজেটে ২০২৬-২৭: তামাক কর ও নীতি সংস্কারের শেষ সুযোগ’ শীর্ষক একটি বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাজেটে কর প্রশাসনের উন্নয়ন ও কর ফাঁকি রোধে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও তামাক কর কাঠামো আরও কার্যকর করার সুযোগ রয়ে গেছে। সংবাদ সম্মেলনে পিপিআরসির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মুহম্মদ ইহতিসাম হাসান বলেন, বারবার কর ও মূল্য সমন্বয়ের পরও সিগারেট এখনো অনেক ভোক্তার নাগালের মধ্যে রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তামাক থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লেও ২০২৪ সাল থেকে সামগ্রিক সিগারেট সরবরাহ কমতে শুরু করেছে, যা কর-চালিত মূল্যবৃদ্ধির আরও সুযোগের ইঙ্গিত দেয়। তবে চার স্তরবিশিষ্ট সিগারেট কর কাঠামো বহাল থাকায় ধূমপায়ীরা ধূমপান ছাড়ার বদলে সস্তা ব্র্যান্ডে চলে যাচ্ছেন, ফলে জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, নিম্ন-মূল্যের সিগারেট স্তরের অস্তিত্ব কর বৃদ্ধির জনস্বাস্থ্যগত প্রভাবকে দুর্বল করে দেয়। এ কারণে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করা, প্রতি ১০ স্টিকের প্যাকেটের ন্যূনতম মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেন মূল্যবৃদ্ধির সুফল সরাসরি সরকারি রাজস্বে প্রতিফলিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও পরিচালক ড. শাফিউন নাহীন শিমুল বলেন, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ বিলিয়ন সিগারেট স্টিক বিক্রি হয়, যা একটি বিশাল তামাক বাজারের নির্দেশক। ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির পরও ধূমপানের হার প্রত্যাশিত হারে কমেনি।সাম্প্রতিক কর পদক্ষেপগুলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করছে কি না এবং মূল্যবৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরকার নয়, তামাক কোম্পানিগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে কি না—প্রশ্ন তোলেন তিনি। বক্তারা নতুন নিকোটিন পণ্যের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, নিকোটিন পাউচ ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক অনুমোদন পেয়েছে এবং বাংলাদেশকে অন্যান্য দেশের ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সতর্ক থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ তুলে ধরে তারা বলেন, বেশ কয়েকটি দেশে তরুণদের মধ্যে নিকোটিন পণ্যের দ্রুত বিস্তার নিয়ন্ত্রক বিলম্বের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস. এম. আব্দুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দিকে অগ্রসর হতে হলে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর তামাক কর নীতি অপরিহার্য। তার মতে, তামাক কর অসংক্রামক রোগের বোঝা কমাতে কার্যকর হাতিয়ার হলেও দেশের কর ব্যবস্থা এখনো বিশ্বের অন্যতম জটিল কাঠামোর একটি। তিনি তামাক করকে কেন্দ্রীয় নীতি হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা এবং কাঠামো সরলীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আলোচনায় ধোঁয়াবিহীন তামাক খাতের নিয়ন্ত্রণ ঘাটতির বিষয়ও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ ধরনের পণ্যের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বিস্তৃত হলেও লাইসেন্সিং, নিবন্ধন ও ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থার অভাবে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এছাড়া বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপরও জোর দেওয়া হয়। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মোহাম্মদ আকরাম বলেন, হাসপাতাল, পার্ক ও খেলার মাঠের নির্ধারিত সীমার মধ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারীদের জরিমানা করার ক্ষমতা রয়েছে। এসব ব্যবস্থার আরও সক্রিয় ব্যবহার তামাক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। পিপিআরসির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ড. হোসাইন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকের দাম বাড়ানো হলেও মূল প্রশ্ন হলো, এই পদক্ষেপগুলো জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথেষ্ট কি না। তিনি বলেন, শুধু দাম বাড়ানোই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং সেই বৃদ্ধি তামাক ব্যবহার কমাতে এবং সরকারি রাজস্ব বাড়াতে কতটা কার্যকর, সেটিই বিবেচ্য। একই সঙ্গে তিনি অবৈধ বাণিজ্য, বাজার ফাঁকি এবং ই-সিগারেটের নিয়ন্ত্রণমূলক সংজ্ঞা শিথিল হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।




