জাতীয়প্রধান খবর

ঢাকার ৯৮ বাস রুট কমে ৩২, সাত রুটে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু

রাজধানীতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে ছয়টি সাধারণ ও একটি চক্রাকার মিলিয়ে মোট সাতটি রুটে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার বেলা ১১টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী শিমুল বিশ^াস। রুটগুলো হচ্ছে-গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে ঢাকার আজিমপুর, মিরপুর থেকে কেরাণীগঞ্জ, ঘাটারচর থেকে ডেমরা, ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর, ঘাটারচর থেকে ধউর ও টঙ্গী থেকে আজিমপুর। এছাড়া মিরপুর-১ থেকে কচুক্ষেত, সৈনিক ক্লাব, জাহাঙ্গীর গেইট, আগারগাঁও হয়ে আনসার ক্যাম্প রুটে চক্রাকার বাস চালু করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শিমুল বিশ^াস বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হওয়া সাতটি রুটের কোনো কোনোটিতে ৩০০টি করে বাস রয়েছে। উন্নত বিশে^র নগরের আদলে ঢাকার ৩২টি রুটের প্রতিটির জন্য বাসের আলাদা রং নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে শিমুল বিশ^াস বলেন, “আজ (গতকাল) শুধু ফটোসেশন করলাম আর পরে বন্ধ হয়ে যাবে- এমনটা হবে না। “কায়েমি শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে অতীতে সব সরকার চাইলেও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে বিলম্ব হয়েছে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কঠোর অবস্থান নিয়ে সবাইকে প্রশ্ন ও জবাবদিহির আওতায় এনে পরিবর্তনকে দ্রুততর করেছেন।”
রুট ০৪: শিববাড়ী-গাজীপুর থেকে আজিমপুর-ঢাকেশ^রী মন্দির (ভায়া টঙ্গী-উত্তরা-এয়ারপোর্ট-মহাখালী-সায়েন্সল্যাব-নিউ মার্কেট) – দূরত্ব ৪৩ কিমি, ভিআইপি সিটি পরিবহন, বাস সংখ্যা ২৫৩টি।
রুট ০৪ (এক্সপ্রেসওয়ে): টঙ্গী থেকে আজিমপুর-ঢাকেশ^রী মন্দির (ভায়া উত্তরা-এয়ারপোর্ট এক্সপ্রেসওয়ে-ফার্মগেট-সায়েন্সল্যাব) – দূরত্ব ২৮ কিমি, ঢাকা চাকা (এসি বাস) সিটি পরিবহন, বাস সংখ্যা ২০টি।
রুট ১৭: মিরপুর-চিড়িয়াখানা থেকে চুনকুটিয়া-কেরাণীগঞ্জ (ভায়া টেকনিক্যাল-শ্যামলী-সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ-প্রেস ক্লাব-বাবুবাজার ব্রিজ) – দূরত্ব ২৩ কিমি, চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহন (দিশারী, তানজিল, মেট্রো লিংক), বাস সংখ্যা ১৩৩টি।
রুট ১৯: ঘাটারচর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার (ভায়া সায়েন্স ল্যাব-শাহবাগ-মালিবাগ-রামপুরা ব্রিজ-বনশ্রী) – দূরত্ব ২২.৩ কিমি, রমজান আলী সিটি পরিবহন (রমজান পরিবহন), বাস সংখ্যা ৮০টি।
রুট ২৪: ঘাটারচর থেকে চিটাগাং রোড-কাঁচপুর (ভায়া সায়েন্স ল্যাব-শাহবাগ-প্রেস ক্লাব-গুলিস্তান-হানিফ ফ্লাইওভার-সাইনবোর্ড) – দূরত্ব ৩৩.২ কিমি, থ্রি স্টার সিটি পরিবহন (রজনীগন্ধ্যা, মালঞ্চ, সময়), বাস সংখ্যা ১২০টি।
রুট ৩৩: ঘাটারচর থেকে আব্দুল্লাহপুর ধউর (ভায়া আসাদগেট-শ্যামলী-মিরপুর-১০-কালশী-কুড়িল বিশ^রোড-এয়ারপোর্ট) – দূরত্ব ২৮ কিমি, পিপিবি সিটি পরিবহন (প্রজাপতি, পরিস্থান, বিকাশ), বাস সংখ্যা ২২৫টি। সার্কুলার রোড নম্বর ৬: মিরপুর-১ আনসার ক্যাম্প থেকে কাকলী-বনানী (সার্কুলার, ভায়া মিরপুর-১০, কচুক্ষেত, মহাখালী, আগারগাঁও, শ্যামলী) – দূরত্ব ২২.৫ কিমি, ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস (এসি বাস), বাস সংখ্যা ৩০টি। দীর্ঘদিন পরিবহন খাতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পাবনা-৫ আসনের এ সংসদ সদস্য বলেন, “এ খাতের সীমাবদ্ধতা, দোষত্রুটি ও সমালোচনার জন্য প্রতি মুহূর্তে লজ্জাবোধ করি এবং আমরা আত্মসমালোচনা গ্রহণ করি। আমরা বৈরী সমালোচনা ও বকাবকি থেকে মানুষের দোয়ায় ফিরতে চাই।” বিশৃঙ্খলার কারণে অল্প কিছু মানুষ লাভবান হলেও শৃঙ্খলা ফিরলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উপকৃত হয় মন্তব্য করে শিমুল বিশ^াস বলেন, “ঢাকা নগরের অসহনীয় যানজট এবং জানমালের অনিরাপদ ব্যবস্থার অবসান সবাই চায়। আজ ব্যাটারিচালিত রিকশা বা টেসলা বাহিনী এবং রিকশা গোটা ঢাকা দখল করে রেখেছে। “গরিব মানুষের জন্য এগুলোর প্রয়োজন থাকলেও যানজটে আমাদের কত শ্রমঘণ্টা, সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে, তার হিসাব করলে মাথা ব্যথা হয়ে যাবে। ঢাকায় শৃঙ্খলা আনতে পারলে তা দেশের জিডিপি ও প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখবে।” এ পরিবহন নেতা বলেন, “বিদেশিরা বিমানবন্দর থেকে নেমে সচিবালয় বা হোটেলে যাওয়ার পথে সড়কের বিশৃঙ্খলা দেখে কোনো মালিক, শ্রমিক বা দলকে নয়, গোটা বাংলাদেশ সম্পর্কেই রূঢ় মন্তব্য করে। “তখন বাংলাদেশে বসবাসকারী সবাই তার অংশীদার হয়ে যায়। ঢাকা সুশৃঙ্খল হলে এর ঢেউ সারা দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে এবং মানুষ অন্যান্য অনিয়ম ও অরাজকতা দূর করতেও শক্তি পাবে।” এ অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনের আগে বিশে^র অন্যতম সমৃদ্ধ স্থান ছিল উল্লেখ করে শিমুল বিশ^াস বলেন, “সাড়ে তিনশ বছর আগে আমরা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলাম বলেই কবি ‘সুজলা সুফলা সোনার বাংলাদেশ’ লিখেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহ, দখল-বেদখল ও নিজেদের দুর্বলতায় আমরা আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, বার্মার আরাকান, বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমানা হারিয়েছি।” অনুষ্ঠানে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, “সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও দুর্ঘটনা রোধে ঢাকার ৯৮টি বাস রুটকে ৩২টি মূল রুটে নামিয়ে আনা হয়েছে, যার মধ্যে আজ (গতকাল) কম-বেশি ১৮টি ব্যানারের বাসকে ছয়টি কোম্পানির অধীনে এনে ছয়টি রুট চালু করা হলো। “পাশাপাশি শহরের ভেতরে নির্ধারিত ২৫টি চক্রাকার রুটের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে অনুমোদিত পাঁচটির মধ্যে এসি বাস দিয়ে একটি রুট চালু হয়েছে; বাকি চারটি রুটের জন্য ২৭ আসনের মিনিবাসের ফরমাশ দেওয়া হয়েছে, যা আগামী দুই মাসের মধ্যে চালু হবে।” তিনি বলেন, নতুন এ ব্যবস্থায় শ্রমিকদের চুক্তির বদলে বেতনভিত্তিক কাজ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে বাসমালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতির কাছে। দ্রুতই ৩২টি রুটের বাসে আলাদা রং, রুট নম্বর ও ডিজিটাল বোর্ড যুক্ত করা হবে। অনুষ্ঠানে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, “এ কার্যক্রম কোনো পাইলট প্রজেক্ট নয়, এটি চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এবং এখান থেকে পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।” নতুন উদ্যোগের বিরোধিতা করে সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে রাখা ‘দুষ্কৃতকারীদের’ বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ডিটিসিএ ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আরবান ট্রান্সপোর্ট অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আনিসুর রহমান, বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এম এ বাতেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম। রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০১৫ সালে তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেন। আটটি রুটে ভাগ করে প্রতিটি রুটে আলাদা রঙের বাস চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও ২০১৭ সালে তার মৃত্যুর পর সেউ উদ্যোগ থমকে যায়। পরে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে নতুন পরিকল্পনায় ২৪৬টি বাস কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠন এবং ২৭৮টি রুট পুনর্বিন্যাস করে ২২টি রুট নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঘাটারচর-সাইনবোর্ড রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহন চালু হলেও অন্য বাস কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করা যায়নি। ফলে এ উদ্যোগও বন্ধ হয়ে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাসমালিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাড়া মেলেনি। এরপর বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক বৈঠক করেন। এর ধারাবাহিকতায় ছয় মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসব্যবস্থা কার্যক্রম আংশিকভাবে শুরু হলো।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!