৬ মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ, কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার মানুষ: সিপিডি

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, অর্থনীতির ৩১টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনমন হয়েছে। একই সময়ে দেশের প্রধান তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক। সিপিডির আশঙ্কা, অর্থনীতিকে সঠিক পথে পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করা না গেলে সরকার আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট ও স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবে পড়তে পারে। এ জন্য অর্থনৈতিক সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল সোমবার রাজধানীতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রধান দুটি প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা থাকলেও ছয় মাসের মূল্যায়নে কিছুটা অস্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি কোন অবস্থায় ছিল, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি। সরকার বারবার খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার কথা বললেও সেই পরিস্থিতির একটি সুনির্দিষ্ট নথি না থাকায় সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য ও পরিসংখ্যানের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ড. দেবপ্রিয়ের মতে, সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। প্রয়োজনীয় সংস্কারে রাজনৈতিক সাহসের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সিপিডি জানিয়েছে, নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও গৃহীত পদক্ষেপ মূল্যায়নে তারা প্রায় ৩৬২টি উদ্যোগের তালিকা করেছে। এগুলোকে ৯টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর আওতায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সুশাসনের ক্ষেত্রেও ১০৫টি ঘটনা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীÑএই তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। গ্যাস সংকটের কারণে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড, সিরামিকসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। সিপিডির হিসাবে, অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি সূচকে উন্নতি হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু ঋণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ বাকি ১৯টি সূচকে অবনতি বা গভীর উদ্বেগের কারণ দেখা গেছে। সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরে আসেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক রয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না। এদিকে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে সিপিডি। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন ঋণ নেওয়ার আগে দেশের বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ, পরিশোধের সময়সীমা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন ছিল। সরকারের বেশ কয়েকটি পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন, স্টার্টআপ তহবিল গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেনভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় এবং কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফের উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে। এ ছাড়া নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সুশাসনের ক্ষেত্রে সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সিপিডি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়। আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন আইন ও ব্যবস্থায় ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার পরও মব সহিংসতা এবং নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত থাকায় সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। সিপিডির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা গেলেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না গেলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমে একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে, তবে নেতিবাচক প্রবণতার আধিক্য রয়েছে এবং এসব সমস্যার বড় অংশই কাঠামোগত। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষাÑ এই ৯টি খাত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কেবল ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপগুলোই মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ এখনও রয়েছে। অন্যদিকে, প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনও নেতিবাচক থাকায় মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। মার্চ থেকে মে সময়ে মোট কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ব্যয়, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি কাটছাঁটের চাপ বাড়তে পারে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। বিনিয়োগ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে। সিপিডির মতে, এসব সূচক দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না। জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত চলমান গ্যাস সংকটকে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহে জটিলতা এবং সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতায় গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে শিল্প উৎপাদনের সাধারণ সূচক এবং উৎপাদনশিল্পের সূচক- দুটির প্রবৃদ্ধিই শূন্যে নেমে এসেছে। শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণও কমেছে। এ পরিস্থিতিতে সময়বদ্ধ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত, উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এর মধ্যে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা এবং সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। সিপিডির মতে, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ প্রয়োজন। বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্টের মধ্যে বিপিএম-৬ হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে, চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে গেছে এবং প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বলে সিপিডির মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের উপস্থাপনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতির কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কর্মসূচির অভাব, দুর্বল রাজস্ব ও আর্থিক কাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের ধাক্কা, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের অভাব। সিপিডির মতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বলতে শুধু মূল্যস্ফীতি কমাকে বোঝানো যাবে না। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও সুদের হারে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দৃশ্যমান উন্নতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রয়োজন। সিপিডি বলছে, দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সহায়তা দিতে আগামী অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত ‘মূল বাজেট’ বা কোর বাজেট প্রস্তুত করা দরকার। এটি হতে হবে বাস্তব সময়ের তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কাঠামোর ভিত্তিতে। পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংক সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসন, উন্নয়ন ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ, নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও ডিজিটালাইজেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং সংসদের কাছে নিয়মিত জবাবদিহিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। সামগ্রিক মূল্যায়নে সিপিডি মনে করছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অর্থনীতির প্রধান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তাই পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




