শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তাল মিরপুর-গাজীপুর, পুলিশের গাড়িতে আগুন

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গতকাল রোববার সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুরে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে ওঠে পোশাকশিল্প এলাকা। মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ভাঙচুরের পর পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। সংঘর্ষ চলাকালেই দুপুরে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। পরে বিকেলে সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই এলাকার শ্রমিকেরা হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কও অবরোধ করেন। গতকাল গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। এতে মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকাল সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। দুপুর ১টা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলে। এ সময় শ্রমিকেরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। পুলিশের পক্ষ থেকে লাঠিপেটার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সংঘর্ষের মধ্যে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও বাধার মুখে পড়েন। সংঘর্ষে আমার দেশের মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক পাপ্পু হোসেন আহত হন। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশের কয়েকজন সদস্যও আহত হয়েছেন। পরিস্থিতির কারণে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন দুপুর ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্টেশনগুলোতে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়। মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও মিরপুর-১১ ও ১২ নম্বরের দিকে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পুলিশের ভাষ্য, শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে আন্দোলনকারীরা সাড় না দিলে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও লাঠিসোঁটা নিক্ষেপ করেন। পরে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে মিরপুর-২, ১১, ১৩ ও শেওড়াপাড়ার দিকে ছড়িয়ে পড়েন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ প্রতিরোধ-উত্তর) মো. মাহিদুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দুষ্কৃতকারীরাও মিশে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। তাঁর দাবি, পুলিশ লাঠিপেটা করেনি। এক সাংবাদিকের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর কাছে তথ্য নেই; বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। সংঘর্ষের ঘটনায় ২৮ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তাঁরা সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢ়ুকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার চেষ্টা করছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান। তিনি বলেন, মিরপুর-১০ ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতা। ডিবি কর্মকর্তা রাকিব খানের দাবি, ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ এ কার্যক্রমের সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, আলিফ মোল্লাহ ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনেছেন। আন্দোলনস্থলে প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তাঁদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। গাজীপুরেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টার দিকে কোনাবাড়ীতে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় ভাঙচুরের পর কোনাবাড়ী ট্রাফিক পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। বক্সের আসবাব পুড়ে গেলেও সেখানে মূল্যবান কিছু ছিল না বলে পুলিশ জানিয়েছে। কোনাবাড়ী ছাড়াও শফিপুর, মৌচাক ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। শ্রমিক বিক্ষোভের মুখে গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল রোববার দুপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পর মহাসড়ক ছেড়ে দেন শ্রমিকেরা। এরপর যান চলাচল শুরু হয়। তবে অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে যান চলাচল ধীরগতির ছিল। সংঘর্ষের মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের মধ্যেই গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ-সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে মন্ত্রণালয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি করা হয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। প্রচলিত কাঠামোর চার সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের জন্য মালিক ও শ্রমিকপক্ষের একজন করে অতিরিক্ত প্রতিনিধি যুক্ত করে ছয় সদস্যের এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের কাজ হবে পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা। তবে নতুন মজুরির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। মন্ত্রী জানান, শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টার আলোচনা এবং বিশেষ করে পোশাকশ্রমিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা তাঁদের মনোনীত সদস্যদের নাম জমা দিয়েছেন। সরকার, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সম্মতিতে বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এর আগের দিন গত শনিবার বিজয়নগরের শ্রম ভবনে পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। বিকেলে সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭ কারখানা বন্ধ, মহাসড়ক অবরোধ
গতকাল রোববার বিকেলে সাভার-আশুলিয়ার ১৭৭টি পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এদিন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। শ্রমিকদের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। পাশাপাশি কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ এবং ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগের দাবিও জানিয়ে আসছেন তাঁরা। বিভিন্ন কারখানায় বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের দাবিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। আগের দিনও বিক্ষোভ, ভাঙচুর
রোববারের আগে শনিবারও মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই দিন অন্তত ১৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়, তাঁদের মধ্যে পুলিশ সদস্যও ছিলেন। মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকায় হিমালয়া গার্মেন্টসের শ্রমিকদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় হিমালয়া গার্মেন্টস ও পাশের বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুর চালানো হয়। একই দিন বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে পল্লবীর ২২ তলা গার্মেন্টস কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এর আগে বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কয়েক শ শ্রমিক মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পরে তাঁরা পুরবী সিনেমা হল ও মেট্রোরেল স্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে আবারও সড়ক আটকে দেন। দুই দফায় প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরোধ চলেছিল। তৈরি পোশাকশিল্পে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে। ওই মজুরি কার্যকর হয় একই বছরের ডিসেম্বরে। তখন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়, যা ছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। তিন বছর মেয়াদি ওই মজুরিকাঠামোর মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এদিকে ২০২৬ সালে শ্রম আইন সংশোধন করে ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।




