মামলার জট বাড়ছে চট্টগ্রামের শ্রম আদালতে

উদ্বেগজনক হারে মামলার জট বাড়ছে চট্টগ্রামের শ্রম আদালতগুলোতে। এক বছরে নতুন মামলা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও নিষ্পত্তির হার মাত্র ১৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতে (১ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের ১ম ও ২য় শ্রম আদালতে মোট বকেয়া মামলা ছিল ১ হাজার ৮৬৮টি। এর মধ্যে ১ম শ্রম আদালতে ১ হাজার ৩২১টি এবং ২য় শ্রম আদালতে ৫৪৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। একই বছরে নতুন করে দায়ের হয় ৫৫৯টি মামলা, যা শুরুর বকেয়ার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। পুরো বছরে দুই আদালত মিলিয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৩৭টি মামলা। কিন্তু বছরের শুরুতে থাকা বকেয়া, নতুন দায়ের এবং বছরের মধ্যে যুক্ত হওয়া মামলার তুলনায় নিষ্পত্তির হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে। ফলে বছরের শেষে (৩১ ডিসেম্বর) বিচারাধীন মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৭০টিতে, যা বছরের শুরুর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। মাসভিত্তিক তথ্য বলছে, বছরের শুরুতে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে নিষ্পত্তির হার তুলনামূলক বেশি থাকলেও এপ্রিল ও মে মাসে তা কমে যায়। জুন ও জুলাইয়ে দায়ের ও নিষ্পত্তি প্রায় সমান থাকলেও আগস্টে সর্বোচ্চ ১২৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। তবে ডিসেম্বর মাসে নতুন মামলা দায়ের সর্বোচ্চ ৯১টিতে পৌঁছায়, যেখানে নিষ্পত্তি হয় ৬১টি। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসে ১ম শ্রম আদালতে নথিপত্র সমন্বয়ের কারণে হঠাৎ প্রায় ১ হাজার ২০০টি মামলা যুক্ত হওয়ায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অন্যদিকে ২য় শ্রম আদালতে আগস্টে সর্বোচ্চ নিষ্পত্তি হলেও সার্বিকভাবে নিষ্পত্তির গতি ধীরই ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারকের স্বল্পতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা এই জটের প্রধান কারণ। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সেলিম উল্লাহ চৌধুরী বলেন, শ্রম আদালতের মামলা তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য আদালতের সংখ্যা ও জনবল বাড়ানো জরুরি। আপিল আদালতের সংখ্যাও বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। শ্রম আদালতের আওতা বিস্তৃত হওয়াও জট বাড়ার একটি কারণ। চট্টগ্রামের ১ম শ্রম আদালতের অধীনে রয়েছে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চাঁদপুর জেলা। আর ২য় শ্রম আদালতের অধীনে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট। আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শ্রম আদালতের বেশিরভাগ দেওয়ানি মামলা বেতন বকেয়া, চাকরিতে পুনর্বহাল ও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত। আর ফৌজদারি মামলাগুলো মূলত শ্রম আইন না মানার অভিযোগে করা হয়। এসব মামলা করে থাকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো। জটের পেছনে আরও কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে ‘মিস কেস’, শুনানির দিনে পক্ষগুলোর অনুপস্থিতি এবং নোটিশ না পাওয়ার অজুহাত। শ্রম আদালতে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, শ্রম আইনের ২১৩ ও ৩৩ ধারার মামলায় সময় বেশি লাগে, কারণ এসব মামলায় বিচারকের পাশাপাশি মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক সময় তাঁরা উপস্থিত থাকেন না, ফলে বিচার বিলম্বিত হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি, আইন সংস্কার এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা না গেলে শ্রম আদালতের এই মামলার জট আরও বাড়বে। এতে শ্রমিক ও মালিক-উভয় পক্ষই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন। শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও শিপব্রেকিং ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, শ্রম আদালতে দেওয়ানি পদ্ধতিতে বিচার হওয়ায় সাক্ষ্য-জেরা ও যুক্তিতর্কে দীর্ঘ সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করে। এমনকি একতরফা রায়ের পরও তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়।




