আইটি

অর্ধশত বছর পর চাঁদের পথে সফল যাত্রা

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে ঐতিহাসিক আর্টেমিস-২ মহাকাশ মিশনের উৎক্ষেপণ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এই অভিযানের মাধ্যমে চার নভোচারী চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণের এক ঐতিহাসিক যাত্রায় শামিল হলেন, যা গত ৫৩ বছরের মধ্যে মানুষের প্রথম নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথ ছাড়িয়ে মহাকাশে পাড়ি জমানোর নজির। স্থানীয় সময় গত বুধবার ও বাংলাদেশ সময় গত বৃহস্পতিবার ভোরে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে এই মিশনটি শুরু হয়। এটি মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার মানুষকে পুনরায় চাঁদে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানুষ চাঁদের পথে রওনা হচ্ছে। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালে অবস্থিত নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ৩২ তলা উচ্চতার একটি রকেট মহাকাশে যাত্রা শুরু করে। এই মাহেন্দ্রক্ষণটি দেখার জন্য সেখানে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। আর্টেমিস-২ মিশনের চার সদস্য হলেন- নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। তারা চাঁদের চারপাশে প্রায় ১০ দিনের এক অভিযানে রয়েছেন, যা মানুষকে কয়েক দশকের মধ্যে মহাকাশের সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যাবে। এই রুদ্ধশ^াস অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানের প্রতিটি সিস্টেম নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে, যা ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি ও মঙ্গল অভিযানের পথ সহজ করবে। আর্টেমিস-২ মিশনের উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক মিশনে আপনারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস টিমের প্রাণশক্তি, আমেরিকান জনতা ও বিশ^জুড়ে আমাদের অংশীদারদের সাহসী মনোবল এবং একটি নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্ন। শুভকামনা, আর্টেমিস ২। এগিয়ে চলো।’ উড্ডয়নের পাঁচ মিনিট পর কমান্ডার ওয়াইজম্যান ক্যাপসুল থেকে তাদের লক্ষ্যবস্তু দেখে বলেন, ‘আমরা একটি সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখতে পাচ্ছি, আমরা ঠিক সেদিকেই এগিয়ে চলেছি।’

অভিযানের প্রথম এক থেকে দুই দিন নভোচারীরা পৃথিবীর উচ্চকক্ষপথে অবস্থান করবেন। সেখানে তারা ওরিয়ন মহাকাশযানটির জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা, যানটিকে এগিয়ে নেওয়ার জ্বালানি শক্তি এবং সঠিক পথ চলার নেভিগেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিখুঁতভাবে কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন। যানটি গভীর মহাকাশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত কি না তা যাচাই করাই এর মূল লক্ষ্য। এই পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর, ওরিয়ন তার ইঞ্জিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দহন ঘটাবে যা ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ নামে পরিচিত। এটি মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বের করে চাঁদের অভিমুখে একটি নির্দিষ্ট পথে পাঠিয়ে দেবে। চাঁদের দিকে পৌঁছাতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগবে। পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে যেতে যেতে নভোচারীরা মহাকাশযানের প্রতিটি সিস্টেমের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখবেন। এরপর ওরিয়ন চাঁদের পেছন দিক দিয়ে একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ ধরে উড়বে। এটি এমন একটি পথ যা চাঁদ এবং পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্যবহার করে প্রাকৃতিকভাবেই মহাকাশযানটিকে পুনরায় পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে আনে, যাতে জ্বালানি খরচ হয় অত্যন্ত সামান্য। অভিযানের এই পর্যায়েই মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে তার সর্বোচ্চ দূরত্বে অবস্থান করবে। চাঁদ প্রদক্ষিণ শেষে পৃথিবীতে ফেরার জন্য নভোচারীরা আরও কয়েক দিন ব্যয় করবেন। এ সময় তারা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, থার্মাল কন্ট্রোল এবং ক্রু অপারেশনের ওপর অতিরিক্ত কিছু পরীক্ষা চালাবেন। ওরিয়ন যখন পৃথিবীর কাছাকাছি পৌঁছাবে, তখন এর ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার (২৫ হাজার মাইল) বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এরপর এটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে এবং সেখান থেকে উদ্ধারকারী দল নভোচারীদের নিয়ে আসবে। নাসার অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যখন শেষবার চাঁদে হেঁটেছিলেন, তখন বর্তমান বিশে^র অর্ধেক জনসংখ্যার জন্মই হয়নি। তাই ‘আর্টেমিস’ মিশনকে উপস্থাপন করা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের একটি চন্দ্রাভিযান হিসেবে। নাসার সায়েন্স মিশন চিফ নিকি ফক্স এই সপ্তাহের শুরুতে বলেছিলেন, “এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের অ্যাপোলো অভিযানের কথা মনে নেই। এমন অনেক প্রজন্ম আছে যাদের জন্মই হয়নি যখন অ্যাপোলো উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এটিই তাদের ‘অ্যাপোলো’।”

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!