যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে সরকার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী

দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও পানিসংকট নিরসনে জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে ‘তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। সকালের সংসদ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতি, কৃষি, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, শিক্ষা এবং জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সংসদ সদস্যসহ উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের পানি ও তিস্তা নিয়ে যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে, বর্তমান সরকার তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং এর স্থায়ী সমাধানে বদ্ধপরিকর।
তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে মেগা পরিকল্পনা: উত্তরাঞ্চলের পানির অধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি বড় উদ্বেগ হচ্ছে পদ্মা ও তিস্তা নদী। বিএনপি সরকার বরাবরই কৃষি ও কৃষিবান্ধব সরকার এবং যখনই দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে, মানুষের পানির অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সারা বছর কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এরপর তিস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইনশাআল্লাহ এই সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন: কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নের লক্ষ্যে নদী ও খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের অনেক এলাকায় বর্ষাকালে পানি থৈথৈ করলেও শুষ্ক মৌসুমে সামান্য দূরত্বের জমিতেও কৃষক সেচের পানি পান না। এ সংকট দূর করতে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনর্খননের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত তিন মাসেই প্রায় ৯০০ কিলোমিটার খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
১৩ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ ও নতুন ‘কৃষক কার্ড’: নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের প্রথম সপ্তাহের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে। তিনি জানান, কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিতে একটি বিশেষ ‘কৃষক কার্ড’ চালুর কাজ চলছে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর কৃষকদের কাছে সরাসরি আড়াই হাজার টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা আরও ১০টি বিশেষ সুবিধা পাবেন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষকের হাতে এ কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ও খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি: চলচ্চিত্র, থিয়েটার, সংগীত, ওটিটি, ডিজিটাল কনটেন্ট, গেমিং, ফ্যাশন ও সফটওয়্যারের মতো উদীয়মান খাতগুলোকে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ হিসেবে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ খাতের মাধ্যমে দেশে বিপুল কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি আরও জানান, দেশে-বিদেশে সাফল্য অর্জনকারী খেলোয়াড়দের জন্য প্রথমবারের মতো একটি ‘জাতীয় সম্মানী কাঠামো’ চালু করা হবে। পাশাপাশি খেলাধুলাকে তরুণদের জন্য সম্মানজনক পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে আগামী এক বছরের মধ্যে জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে ‘স্পোর্টস’কে একটি স্বাধীন বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চালু করা ‘নতুন কুঁড়ি’র আদলে খেলাধুলার জন্য একটি নতুন স্পোর্টস সংস্করণ চালুর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মোচনের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বৈশ্বিক শ্রমবাজারে আরও বেশি দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে নতুন নতুন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তিনি বলেন, প্রবাসীরা দেশে ফেরার পর কিংবা বিদেশে অবস্থানকালে যেসব দৈনন্দিন সমস্যার মুখোমুখি হন, সেগুলো থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে সরকার একটি ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর ওপর কাজ করছে।
জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা, শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের অঙ্গীকার: বিগত দেড় দশকের শাসনামলে জ্বালানি ও শিক্ষা খাত যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশীয় অনুসন্ধান অবহেলা করে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ায় জ্বালানি খাতে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ঝুঁকি কমাতে বর্তমান সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শিক্ষিত, দক্ষ ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। অতীতের ধ্বংসস্তূপ ও গ্লানি মুছে যুবসমাজের স্বপ্নের একটি নতুন, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রস্তাবিত বাজেট ‘জীবনবান্ধব’ বাজেট: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’ নামে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা যে বাজেট উপস্থাপন করছি, এটির আমি একটি নামকরণ করতে চাই। সেটি হচ্ছেÑ জীবনবান্ধব বাজেট। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই সংসদের যাত্রা শুরু হওয়ার পর আমরা বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করেছি। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, কোথাও ঐকমত্য হয়েছে, কোথাও মতভেদ হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা দেশের মানুষের সামনে একটি আশার আলো তুলে ধরতে পেরেছি। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। সবাই যদি সব বিষয়ে একমত হতেন, তাহলে তো একজনের বক্তব্যই যথেষ্ট হতো। কিন্তু গণতন্ত্রে আলোচনা, মতবিনিময় ও ভিন্নমতের প্রয়োজন রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আমরা জাতির সামনে আশার একটি পথ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অর্জনের কৃতিত্ব শুধু সরকার বা সংসদের নয়, দেশের ২০ কোটি মানুষের। তাদের সহযোগিতার কারণেই সরকার ও বিরোধী পক্ষ একসঙ্গে বসে সুন্দরভাবে আলোচনা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করতে পেরেছে। তারেক রহমান বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সার্বিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে পর্যায়ক্রমে দেশকে একটি গণতান্ত্রিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সংসদে রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র কিংবা ইন্ডিপেন্ডেন্ট সদস্যÑ নির্বিশেষে সবাই দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে সভ্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে আলোচনা করছেন এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এজন্য তিনি সংসদের সব সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাজেট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সংসদের সময়ও অত্যন্ত মূল্যবান। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। অতীতে কী হয়েছে, ভালো-মন্দ কী হয়েছে, সেই বিতর্কে তিনি যেতে চান না। কারণ দেশের মানুষ এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা শুনতে চায়। তিনি বলেন, সরকারি দল হিসেবে একটি সুন্দর, স্বাভাবিক ও বাস্তবমুখী বাজেট উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে যত ভালো বাজেটই হোক না কেন, সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়। বাস্তবতা অনেক কঠিন। তারপরও সর্বোচ্চ বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞান প্রয়োগ করে এমন একটি বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অন্তত কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১টি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জনগণ, বিশেষ করে নারীরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। আমি গৌরব করে বলতে চাই না, তবে বাস্তবতার ভিত্তিতে বলতে চাই। প্রথমেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে চাই যে, এই শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে অতীতের মতো বাজেট ঘোষণার আগে বা পরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবার আমরা দেখিনি। সংসদ নেতা বলেন, রাজনৈতিক দল ও সরকার হিসেবে জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব রয়েছে, তার কিছুটা হলেও সরকার পালন করতে পেরেছে এবং জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দিতে সক্ষম হয়েছে।




