জাতীয়প্রধান খবর

বাংলাদেশ-ভারত স্থলবন্দর ও সীমান্ত হাট ফের চালুর উদ্যোগ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল করতে বন্ধ থাকা সীমান্ত হাট পুনরায় চালু, স্থলবন্দরগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর করা এবং স্থলপথে সুতা আমদানির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. কামাল হোসেন। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। তবে গত দেড় বছরে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি এসেছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে কীভাবে ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও সহজ ও কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, চীনের পর ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বৈঠকে স্থলবন্দরগুলো পুরোপুরি কার্যকর করা, বন্ধ থাকা সীমান্ত হাট পুনরায় চালু করা এবং স্থলপথে সুতা আমদানির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়েও প্রস্তাব এসেছে। এর মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যে গতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারতীয় হাইকমিশনারের উদ্যোগে আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা পাবে। বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষ উন্নয়ন ও অগ্রগতি চায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারত দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। কেউ বড় বা ছোট নয়, সবাই সমান। এই সমতার ভিত্তিতেই দুই দেশকে কাজ করে যেতে হবে বলেও যোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে। ভারতীয় হাইকমিশনার যৌথ বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সফল। এই খাতে ভারত জিপার, মেশিনারি, বোতামসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারে। এতে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা আরও বাড়বে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা পোশাক দেখে তিনি গর্ব অনুভব করেন। বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে যেতে পারে। দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আগামী দিনে আরও সম্প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এদিকে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক ইস্যু থাকলেও তা যেন দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আটকে না দেয়Ñ এমন বার্তা দিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির স্বার্থে বাণিজ্যিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়াই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকÑ দুটি দিকই রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক ইস্যু ও মতপার্থক্য থাকবে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা মূলত জীবনমানের উন্নয়নকে ঘিরে। তিনি বলেন, মানুষ চাকরি চায়, ভালো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা চায়, ভালো রাস্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমেই এসব চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, আসুন, আমরা ব্যবসায়িক সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাই, রাজনীতি তার নিজের পথে চলবে। দুই দেশের সম্পর্ককে আরও টেকসই করতে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। দীনেশ ত্রিবেদীর ভাষায়, ‘ইন্টারডিপেন্ডেন্সি’ বা পারস্পরিক নির্ভরতাই দীর্ঘমেয়াদে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। তিনি বলেন, উন্নয়নের প্রয়োজনে বাংলাদেশ যেমন ভারতের ওপর নির্ভর করবে, তেমনি ভারতও বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করবে। পারস্পরিক এই নির্ভরতা দুই দেশের মানুষকে আরও কাছাকাছি আনতে পারে এবং একটি পরিবারের মতো সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। তবে এই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সমতাÑ এ কথাও স্পষ্ট করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এখানে কেউ বড় কিংবা ছোট নয়। উভয় দেশই সমান। সেই সমতার ভিত্তিতেই পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। দুই দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণদের মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব হলো তাদের জন্য সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা। তিনি বলেন, দুই দেশের মানুষ মেধাবী। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অনেক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা দুই দেশেরই দায়িত্ব। শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্পর্ক তুলে ধরে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা মূলত শান্তিতে থাকতে চায়। আর শান্তি থাকলেই সমৃদ্ধির পথ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ও ভারতÑ দুই দেশেই তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ফলে নীতিনির্ধারণের সময় তাদের ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাণিজ্যিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে পোশাক খাতের কথাও তুলে ধরেন ভারতীয় হাইকমিশনার। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে এ খাতে উৎপাদন বাড়ানো এবং পারস্পরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। দীনেশ ত্রিবেদীর মতে, দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কাজ থেমে থাকা উচিত নয়।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!