খেলাধুলা

ফুটবলে এবার ইলেকট্রনিক কার্ড, বদলে যাবে কি রেফারির পুরোনো নিয়ম?

ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর পরিচিত দৃশ্য এবার দেখা গেল নতুন রূপে। কাগজের কার্ডের বদলে মুঠোফোনের মতো দেখতে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র উঁচিয়ে খেলোয়াড়কে সতর্ক করেছেন রেফারি। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই প্রযুক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে আলোচনা। এর লক্ষ্য শুধু কার্ড দেখানোর পদ্ধতি বদলানো নয়, ম্যাচের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নথিভুক্ত করার কাজও সহজ করা।
উরুগুয়ে কাপের ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাসের ম্যাচে রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলার হাতে দেখা যায় এই ডিজিটাল ডিভাইস। ম্যাচটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই একে ফুটবলের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন। তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের আনুষ্ঠানিক বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহার শুরু হয়নি।
প্রযুক্তিটির পেছনে রয়েছে ‘রেফে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। উরুগুয়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যৌথভাবে নেওয়া এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য, রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ কমানো এবং ম্যাচের তথ্য দ্রুত ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা।
ফুটবল ম্যাচে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে সাধারণত সেই সিদ্ধান্তের বিবরণ নিজের নোটে লিখে রাখতে হয়। পরে এসব তথ্য আবার ডিজিটাল ব্যবস্থায় তুলতে হয়। এই দুই ধাপের কাজ কমিয়ে আনতেই ইলেকট্রনিক কার্ডের ধারণা এসেছে।
প্রকল্পটির পরিচালক মাউরো সাকো উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ফুটবলে একমাত্র যে বিষয়টি এখনো অ্যানালগ রয়েছে, আমরা সেখানে প্রযুক্তি নিয়ে আসতে কাজ করছি।’
সাকো ও তাঁর সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা তিন বছরেরও বেশি আগে এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। বৃষ্টির মধ্যে একটি ম্যাচ দেখার সময় তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, রেফারিদের হাতে লেখা তথ্য পরে আবার ডিজিটাল ব্যবস্থায় তুলতে হয় কেন? সেই ভাবনা থেকেই কার্ড দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্তের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে, এমন যন্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ডিভাইসটির স্ক্রিনে নির্দিষ্ট বোতাম চাপলে হলুদ বা লাল কার্ড দেখা যায়। এতে ম্যাচের ঘটনার সময়ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নথিভুক্ত হয়। ফলে কখন কোন খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো হয়েছে, সেই তথ্য পরে হাতে লিখে রাখার প্রয়োজন কমে যায়। তথ্য সরাসরি ডিজিটাল ব্যবস্থায় পাঠানো সম্ভব হওয়ায় কম্পিউটারে আবার টাইপ করার ঝামেলাও এড়ানো যেতে পারে।
শুধু শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নয়, খেলোয়াড় পরিবর্তন ও পেনাল্টির মতো ঘটনাও নথিভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্মাতাদের লক্ষ্য, এসব তথ্যের ভিত্তিতে উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক ম্যাচ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করা। ভবিষ্যতে তথ্য সরাসরি সংবাদমাধ্যমে পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। ডিভাইসটি ব্যবহারে ওয়াই-ফাই সংযোগের প্রয়োজন হয় না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন যন্ত্রটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা। তাঁর কাছে ডিভাইসটি ব্যবহার করা আরামদায়ক মনে হয়েছে এবং সফটওয়্যারও দ্রুত কাজ করেছে। তবে প্রচলিত কার্ড দেখানোর মধ্যে যে তাৎক্ষণিক নাটকীয়তা রয়েছে, ডিজিটাল পর্দায় সেটি কিছুটা কমে যায় বলে মনে করেন তিনি।
ভারেলার ভাষায়, ‘দ্রুত কার্ড দেখানোর সেই জাদুকরি ব্যাপারটি কিছুটা হারিয়ে যায়, তবে আমার মনে হয় এটি আমাদের অনেক সাহায্য করবে, বিশেষ করে প্রশাসনিক কাজে।’
প্রযুক্তিটির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এখন দৃশ্যমানতা। মাঠের দূরবর্তী স্থান থেকে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় ডিভাইসের স্ক্রিনে কোন রঙের কার্ড দেখানো হয়েছে, তা স্পষ্ট বোঝা কঠিন হতে পারে। সূর্যের আলোয় স্ক্রিন ঠিকমতো দেখা না যাওয়ায় এর আগের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাতিল করতে হয়েছিল। ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাসের ম্যাচেও কিছু দর্শক কার্ডের রং বুঝতে সমস্যায় পড়েন।
প্রকল্পটির সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা বলেন, ‘এটি এমন একটি প্রকল্প, যাতে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। টিভির চেয়ে মাঠে এটি ভালো দেখা গেছে। এখন আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো সব দর্শকের জন্য এর মান উন্নত করা। হলুদ কার্ডকে হলুদ হতে হবে, লাল কার্ডকে লাল হতে হবে এবং মাঠের দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের কাছে তা পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হতে হবে।’
দর্শকদের কাছে কার্ডের রং আরও স্পষ্ট করতে ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি আলো যুক্ত করাসহ বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন নির্মাতারা। তাঁদের লক্ষ্য, রেফারির সিদ্ধান্ত যেন মাঠে উপস্থিত দর্শক এবং টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শক, উভয়ের কাছেই সহজে বোঝা যায়।
ইলেকট্রনিক কার্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন, আবার কেউ প্রচলিত কার্ডের বিকল্প হিসেবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দে লা পেনা জানান, তাঁরা ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের মন্তব্যই দেখেছেন। এমনকি এ নিয়ে তৈরি মিম দেখেও তাঁরা হেসেছেন।
তাঁর মতে, নতুন উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনা হওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করতে সময় লাগবে, সেটি তাঁরা বুঝতে পারছেন।
এদিকে সাকো জানিয়েছেন, ‘রেফে’ ব্র্যান্ডটি নিবন্ধিত হয়েছে এবং ডিভাইসটির হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্ট নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির উন্নয়নকাজের সঙ্গে যুক্ত দলটির ভিত্তি চীনে।
নির্মাতাদের আশা, প্রযুক্তিটি আরও পরিশীলিত ও নির্ভরযোগ্য করে তোলার পর দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হবে। তবে সে জন্য ডিভাইসটির দৃশ্যমানতা, ব্যবহারিক সুবিধা ও মাঠে কার্যকারিতার মতো বিষয়গুলো আরও উন্নত করতে হবে।
ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন নয়। তবে ইলেকট্রনিক কার্ডের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য খেলায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বদলানো নয়, বরং সিদ্ধান্তের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ সহজ করা। পরীক্ষামূলক ব্যবহার থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির বিস্তারে কতটা ভূমিকা রাখে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!