পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আরও ভাবার আহ্বান

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ ও নদী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে এখনো নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। নদী দখল, দূষণ এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের কারণে মানুষসহ প্রাণিজগতের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি’ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ আরিফুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কমিটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা। এ সময় পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও স্বেচ্ছাসেবকরা উপস্থিত ছিলেন। লেখক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নদী সনদ বাংলাদেশে আইন হিসেবে কার্যকর করা হলেও এতে অনুস্বাক্ষর না করলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নদী-সংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। তিনি দাবি করেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রায় ৩০০ হারিয়ে যাওয়া নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু নদী দখলের সঙ্গে জড়িত কিছু সুবিধাভোগী মহল একে ‘খাল খনন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তিনি আরও বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। অন্যথায় এটি ইলিশের প্রজনন ও বঙ্গোপসাগরে পলি জমে নতুন ভূমি সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দেশের পরিবেশ আইনকে যুগোপযোগী করার আহ্বান জানান। ‘প্রাকৃতিক কৃষি’র দেলোয়ার হোসেন বলেন, মানুষের শরীরে পুষ্টি ঘাটতির অন্যতম কারণ মাটির উর্বরতা হ্রাস। তার দাবি, দেশের ৫৬ শতাংশ মাটি অম্লীয় হয়ে পড়েছে, জিংক ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে এবং জৈব উপাদানের পরিমাণও কমে গেছে। তাই মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এখন জরুরি। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও বিভাগীয় প্রধান এবং ক্যাপসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ু ও শব্দদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। অতিরিক্ত শব্দদূষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, বিভিন্ন উপকূলীয় নদীর তীরে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ও জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমের কারণে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. সবুর আহমেদ খাদ্যে ভারী ধাতুর (হেভি মেটাল) উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করার উদ্দেশ্যে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানো হলেও এখন তার প্রভাব অন্য নদীগুলোতে পড়ছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক অধ্যাপক ড. ছায়েদুল হক বলেন, বায়ু ও শব্দদূষণের ফলে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ঘুমজনিত সমস্যা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মতো রোগের প্রকোপ বাড়ছে। প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান বলেন, গত ৫৫ বছরে আমরা প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। উন্নয়নের নামে পরিবেশকে ধ্বংস করা হয়েছে। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন দেশকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ সময় আরও বক্তব্য দেন ইপিএফ চেয়ারম্যান ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান এবং বিজিএমইএ ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিলসহ অন্যান্য বক্তারা।




