রাজনীতি

এআই ব্যবহার করে পরীক্ষায় নকল, ছাত্রদল ও ডাকসুর দুই নেতার শাস্তি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সেবা ব্যবহার করে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে একই বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা হলেন- গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাতহুন কারিব চৌধুরী ও মো. ফেরদাউস। ফাতহুন কারিব চৌধুরী মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য এবং মো. ফেরদাউস হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কারিব চৌধুরীকে ‘পরীক্ষা+২’ এবং ফেরদাউসকে ‘পরীক্ষা+১’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কারিব যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করেছেন, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী দুটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। অন্যদিকে ফেরদাউসের সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ১১ জুন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একটি পরীক্ষা চলাকালে কারিব চৌধুরীকে দুই পায়ের মাঝখানে মোবাইল ফোন রেখে ব্যবহার করতে দেখা যায়। পরে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা জেমিনিতে করা সার্চের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে পরীক্ষার প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরুর পর সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে কারিবের উত্তরপত্র জব্দ করা হয়। সে সময় উত্তরপত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের কিছু অংশের উত্তর লেখা ছিল। পরে জেমিনিতে ওই প্রশ্ন লিখে পাওয়া উত্তরের সঙ্গে তার উত্তরপত্রে লেখা দুই লাইনের হুবহু মিল পাওয়া যায়। এরপর উত্তরপত্র ও সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিষদের সভায় উত্থাপন করা হলে গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় আলোচনার পর কারিবের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হয়। পরে ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কারিবের এক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরীক্ষার হলে কারিব মোবাইল ফোনে এআই ব্যবহার করে উত্তর লিখছিলেন। একপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক বিষয়টি দেখতে পান। অন্যদিকে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন মো. ফেরদাউস। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১০৭ নম্বর কোর্সের রিটেক পরীক্ষা চলাকালে বেলা ১১টার দিকে শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে পরীক্ষার হল থেকে বের হন তিনি। পরে বিভাগের করিডরে গিয়ে এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্মার্টফোন নিয়ে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা তাকে আটক করেন। পরে জব্দ করা মোবাইল ফোনের সার্চ হিস্ট্রি পরীক্ষা করে পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোই সেখানে অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এরপর অসদুপায়ের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তার উত্তরপত্র রিপোর্টসহ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দফতরে পাঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, বিষয়টি পরে শৃঙ্খলা পরিষদে পাঠানো হয়। গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় ফেরদাউসের শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। পরে ৭ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত আদেশে বিষয়টি জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তির বিধান অনুযায়ী, ‘পরীক্ষা+১’ বলতে যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা হয়েছে, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী আরও একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়াকে বোঝায়। একইভাবে ‘পরীক্ষা+২’ ও ‘পরীক্ষা+৩’ বলতে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী যথাক্রমে দুটি ও তিনটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞাকে বোঝানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মোট ৬৪ শিক্ষার্থীকে ‘পরীক্ষা+১’, ‘পরীক্ষা+২’ ও ‘পরীক্ষা+৩’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এদিকে একই বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় এআই ব্যবহার করে অসদুপায়ের অভিযোগে শাস্তির বিষয়টি সামনে আসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষার অনিয়ম ঠেকানো এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে এআই ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!