জাতীয়প্রধান খবর

কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে জনমনে সমালোচনার জন্ম দেওয়া বিধানটি প্রত্যাহারের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। একইসঙ্গে ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, ব্যাংক হিসাব খোলা ও সম্পত্তি নিবন্ধনে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার কমানো, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর করমুক্ত সুবিধা সম্প্রসারণ এবং চিংড়ি, উৎপাদনশীল শিল্প ও স্থানীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর কমানোসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৮তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তি করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ সীমা আরও বাড়ানোর সুপারিশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৫ লাখ টাকা করা উচিত। সংসদ নেতা বলেন, বাজেট প্রণয়নের সময় জমি ক্রয়ের প্রকৃত মূল্য দেখাতে গিয়ে করদাতাদের হয়রানি কমানোর উদ্দেশ্যে একটি বিধান রাখা হয়েছিল। কারণ দেশে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত মূল্যের পরিবর্তে মৌজা মূল্যে জমি নিবন্ধনের প্রচলন রয়েছে। ফলে প্রকৃত ক্রয়মূল্য দেখাতে গিয়ে অনেক করদাতা সমস্যার মুখে পড়েন। সেই জটিলতা দূর করতেই বিধানটি প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন মহল থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে, অনেকেই এটিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। জনগণের মতামতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে তিনি প্রস্তাবিত ওই বিধানটি প্রত্যাহারের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। উচ্চশিক্ষা খাতে সহায়তা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ১০ শতাংশ হারে কর দেয়। এই হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করা উচিত। তবে এ সুবিধার বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, শিক্ষার্থীদের বহুভাষায় দক্ষ করে তুলতে ভাষা শিক্ষা ল্যাব স্থাপন করতে হবে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ বাড়াতে হবে। করের আওতা সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেটে ছাত্রসহ কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন দাখিল বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন এবং সম্পত্তির মিউটেশনের ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এসব বিধান নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাই তিনি এসব প্রস্তাবও প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর করসুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কিছু আয়ের ওপর কর অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে। এটি আরও সম্প্রসারণ করে পাহাড়ি ও সমতলের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যবসা, কৃষি এবং বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠী বসবাস করে। তাই সুবিধাটি শুধু পার্বত্য অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। রফতানিমুখী চিংড়ি শিল্পের বিকাশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অ্যাকুয়া ফিড, ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। এতে দেশের চিংড়ি শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং রফতানি বাড়বে। দেশীয় শিল্পের বিকাশে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচামাল আমদানিতে আরও রেয়াতি সুবিধা দেওয়ারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদন খাতে কাঁচামাল হিসেবে মধু ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মধু আমদানির ওপর বর্তমানে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক রয়েছে। তিনি এই সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত পিভিসি ও পিইটি রেজিন আমদানির ওপর প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়া ফায়ার ডোর উৎপাদনে ব্যবহৃত কোল্ড রোলড শিট আমদানির ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত ফ্ল্যাট রোলড প্লেটেড বা কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড আমদানির ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক এবং সংশ্লিষ্ট আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বৈদ্যুতিক তার উৎপাদনকারী শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে রিফাইন্ড কপার আমদানির ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একইভাবে কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে অপরিশোধিত কাজুবাদাম আমদানির ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার সুপারিশ করেন তিনি। স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এলইডি ল্যাম্প উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সুবিধা প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও একই সময় পর্যন্ত বহাল রাখার আহ্বান জানান। তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এবারের বাজেটে স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে শুধু নতুন উদ্যোক্তাই তৈরি হবে না, সফল স্টার্টআপের মাধ্যমে তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর বর্তমানে আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ ভ্যাটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে অর্থ পরিশোধ করেন। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারায়, তেমনি স্বচ্ছতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভ্যাট কমানো হলে ব্যবসায়ীরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে লেনদেনে উৎসাহিত হবেন। ব্যবসাবান্ধব ভ্যাট কাঠামো গড়ে তুলতে আরও কয়েকটি প্রস্তাব বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বর্ণ, স্বর্ণালংকার, প্লাটিনাম, হীরা এবং রৌপ্য অলংকারের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ও করহার পুনর্র্নিধারণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সব ধরনের মাছ সরবরাহের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী পর্যায়ে আরোপিত ১০ শতাংশ ভ্যাটও সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন তিনি। দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে স্থানীয়ভাবে ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি আদর্শ হারে ভ্যাট প্রদান সহজ করতে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কো-ইফিশিয়েন্ট দাখিলের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার বিষয়টিও বিবেচনার অনুরোধ জানান তিনি। বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সম্পদে নয়, বরং সুশাসন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। জনগণ একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা চায় এবং সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারকদের আবাসন সংকট, গবেষণা কার্যক্রম এবং আদালত ভবনের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সুপ্রিম কোর্টে অতিরিক্ত ১০০ কোটি টাকা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের জন্য অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। জনপ্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে উন্নত সেবা দিতে হলে প্রশাসনকে যেমন জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, তেমনি উপযুক্ত বেতন কাঠামো, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই প্রশাসন দেশ গঠনে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে পারবে। সংসদ নেতা বলেন, সরকার সমস্যাকে আড়াল করতে চায় না। দীর্ঘ দেড় দশকের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী, তরুণরা মেধাবী, কৃষক উৎপাদনশীল, প্রবাসীরা দেশপ্রেমিক এবং উদ্যোক্তারা সম্ভাবনাময়। তাই দেশের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী সংসদের সব সদস্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই বাজেটকে শুধু সরকারের বাজেট হিসেবে না দেখে একটি জাতি পুনর্গঠনের বাজেট হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জনগণের কষ্ট লাঘব, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কৃষক, তরুণ, নারী, প্রবাসী ও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সরকারপ্রধান বলেন, এ দেশে যেন আর কখনও ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে এবং বাংলাদেশকে যেন আর কেউ কোনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে—এটাই হওয়া উচিত সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার। বাজেট প্রণয়নকে অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানান। এছাড়া বাজেট প্রস্তুত, মুদ্রণ ও সংসদীয় কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য জাতীয় সংসদ সচিবালয়, বিজি প্রেস এবং বাজেট অধিবেশন কাভার করা গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্যই জনগণ তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অসংখ্য নেতাকর্মী জীবন দিয়েছেন, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন এবং সর্বস্ব হারিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হওয়ার পর ফিরে এসে তিনি অনেক সহযোদ্ধাকে আর জীবিত পাননি। একইভাবে বিরোধী দলেরও অনেক প্রবীণ নেতাকে আর ফিরে পাননি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। উভয় পক্ষের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের রক্ত ও আত্মত্যাগের ঋণ শোধ করার সবচেয়ে বড় উপায় হলো দায়িত্বশীল রাজনীতি চর্চা করা। জুলাই সনদকে সামনে রেখে সংসদের ভেতরে সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে যেমন ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব, তেমনি সংসদের বাইরেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমত সৃষ্টি ও সংস্কারমূলক কর্মসূচি গ্রহণে রাজনৈতিক দলগুলোর একসঙ্গে কাজ করা উচিত। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পথরেখা নির্ধারণে দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ও জাতীয় সংসদ জনগণের সরকার ও জনগণের সংসদ। জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, জনগণের কষ্ট উপলব্ধি করে এবং জনগণের সম্পদ রক্ষা করাকে পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করে। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে উন্নয়ন হবে ন্যায়ভিত্তিক, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবন হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়।
মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের কবল থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের কবল থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করে এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পেয়েছিলাম। দুর্নীতি, লুটপাট এবং ভুল নীতির কারণে অর্থনৈতিক খাত সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। পুঁজিবাজারে কারসাজির মাধ্যমে মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, এমনকি সর্বস্ব হারিয়ে মানুষ আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছে। সংসদ নেতা বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছিল এবং টাকার মান ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। অহেতুক ‘ভ্যানিটি প্রজেক্ট’ বা লোক দেখানো প্রকল্পের জন্য নেওয়া বিদেশি ঋণ এখন জাতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আমরা এই সংকটকে অজুহাত বানাতে চাই না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে আমরা এই সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করবো। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বিস্তারিত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। এই কারণেই আমরা উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান বিবেচনা হলো— প্রকল্পটি মানুষের জীবনে কী ভূমিকা রাখবে, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। আমরা ঋণনির্ভর নয়, বরং উৎপাদন ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে চাই। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেই প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন সাধারণ মানুষের ঘরে স্বস্তি আসে। যখন দরিদ্র মানুষ সামাজিক সুরক্ষা পায়, তরুণরা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পায় এবং কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পায়। আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে উদ্যোক্তারা হয়রানি ছাড়া ব্যবসা করতে পারবেন এবং আমানতকারীরা তাদের অর্থের নিরাপত্তা পাবেন। দেশীয় শিল্পের বিকাশে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। ভোলা জেলা প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলায় যে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া গেছে, তাকে কেন্দ্র করে সেখানে একটি বিশাল ‘শিল্প পার্ক’ তৈরির পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। এছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাতে সহজে ফান্ডিং বা লোন পেতে পারেন, সেজন্য আইনকানুন সহজ করা হচ্ছে। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় স্পিকারকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সব সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি দেশের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!