মানদণ্ড পূরণ না করলে কোনো প্রকল্প অনুমোদন পাবে না, জানালেন অর্থমন্ত্রী

বিনিয়োগের লাভ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশগত বিবেচনার মানদণ্ড পূরণ না করলে কোনো প্রকল্প অনুমোদন পাবে না বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, “যে কোনো প্রজেক্ট আসবে, এই মানদণ্ড যেটা মিট করবে না, সে প্রজেক্ট আমরা করব না। সিম্পল, করব না। কারণ এটা সরকারের টাকা না, এটা বাংলাদেশের মানুষের টাকা, ট্যাক্সপেয়ার্স টাকা।” গতকাল রোববার ঢাকার আগারগাঁওয়ে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন, পিকেএসএফ ভবনে ‘স্টেপিং ফরওয়ার্ড: দ্য ইনঅগারেশন অব রেইজ টু’ শীর্ষক উদ্বোধনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ^ ব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে ‘রেইজ’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটির আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার কর্মহীন তরুণকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর সম্প্রসারিত ধাপে আরও ২ লাখ তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে দক্ষতা উন্নয়ন ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে সম্প্রসারিত প্রকল্পে ১ হাজার ৬০০ নারীকে হোম বেজড চাইল্ডকেয়ার উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের আওতায় সরাসরি উপকৃত হবেন ৪ লাখ ২৩ হাজার ১০০ জন। দ্বিতীয় পর্যায়ে চর, হাওর, পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি দলিত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী তরুণদের অন্তর্ভুক্তিতেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রকল্প বাছাইয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আমির খসরু বলেন, বিগত দিনের দুর্নীতি ও অপচয়ের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “কোনো প্রকল্পে ভ্যালু ফর মানি ও বিনিয়োগের রিটার্ন আছে কি না, তা দেখা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে কি না এবং পরিবেশগত দিক থেকে গ্রহণযোগ্য কি না, তাও বিবেচনায় নেওয়া হবে। “আমাদের একটা অ্যাকাউন্টেবিলিটি থাকতে হবে যে প্রত্যেকটা প্রজেক্ট করার পেছনে একটা চিন্তা, ধারণা, আউটপুট এবং এটার বেনিফিট জনগণকেও জানতে হবে। আমি জানলে তো হবে না। সাধারণ মানুষকে জানতে হবে আসলে প্রত্যেকটা প্রজেক্টের পেছনে ভাবনাটা কী আছে।” পরিকল্পনা কমিশনে এখন ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “অনেক প্রকল্পে ভ্যালু ফর মানি নেই; রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, এমপ্লয়মেন্ট বা কর্মসংস্থান বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। “আমরা অনেকগুলো প্রজেক্ট বাদ দিয়ে দিচ্ছি। আমরা সিলেক্ট করছি যে প্রজেক্টগুলো এই মানদণ্ডটা মিট করবে।” পিকেএসএফের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, “পিকেএসএফের রোল ভেরি ইমপ্রেসিভ, খুবই ইমপ্রেসিভ।” ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নকে’ সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন আমির খসরু। তিনি বলেন, শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্র থাকলে হবে না; অর্থনীতিতেও মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। “এটার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ করার একটা অধিকার আছে। তারা যাতে পার্টিসিপেট করতে পারে।” অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের তিনটি দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা, অর্থনীতির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং যারা দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচির বাইরে ছিল, তাদের যুক্ত করাই সরকারের লক্ষ্য। “খুব কঠিন বাংলাদেশে। বলা যত সহজ, কাজ করা অত সহজ নয়। আমরা এটা করব, আমাদের প্রোগ্রাম এবং এটা আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।” বিগত দিনের ‘অলিগার্কিক’ ও পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতির কারণে সাধারণ মানুষ অর্থনীতির মূল স্রোত থেকে বাইরে থেকেছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য এখনও বাড়ছে। সে কারণে সরকার সামাজিক কর্মসূচি ও জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। “আপনারা দেখেছেন, আমরা কিন্তু সরকারে আসার পরে কোনো মেগা প্রজেক্ট, কোনো বিশাল বিশাল কর্মকাণ্ডে যাচ্ছি না। আমরা কিন্তু সোশাল প্রোগ্রামে যাচ্ছি।” ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঘর পরিচালনা করা নারীদের স্বীকৃতি ও ক্ষমতায়নের কথা ভেবে সরাসরি তাদের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “যে ভদ্রমহিলা ঘর পরিচালনা করে, সারাদিন সবার টেক কেয়ার করছে, তার কিন্তু ঘরেও কোনো সম্মান নাই, সমাজেও কোনো সম্মান নাই। অথচ ঘরটা আসলে তিনিই চালাচ্ছেন।” তার ভাষায়, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর হাতে সরাসরি অর্থ গেলে পরিবার ও সমাজে তার ক্ষমতায়ন হবে। পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যয় বাড়বে। “তার ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল, তার ক্রয়ক্ষমতা একটু বাড়বে। এটা লোকাল ইকোনমিতে খরচ হবে। এটার একটা মাল্টিপ্লায়ার ইকোনমিক এফেক্ট আছে।” কৃষকদের জন্য সরাসরি সহায়তার কথাও বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিভিন্ন ব্যাংক ঋণ সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। তাই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা দিলে কৃষক সার, বীজসহ মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারবেন। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয়ের চাপ কমানোর কথাও বলেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের কিন্তু নিজের স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে আউট অফ পকেট এক্সপেন্ডেচার দুনিয়াতে আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি, সেটা লজ্জাকর ব্যাপার।” তিনি জানান, সরকার প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ‘সার্বজনীন’ করার দিকে যাচ্ছে। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা যাবে। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সময় কমে আসছে মন্তব্য করে আমির খসরু বলেন, বাকি সময়টুকু ভালোভাবে ব্যবহার করতে হলে দক্ষতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের যে উইন্ডোটা বাকি সময় আছে আমরা এটাকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে চাই।” সৃজনশীল অর্থনীতিকে সরকারের নতুন ভাবনার অংশ হিসেবে তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে পিকেএসএফের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরকারের দর্শন ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির মিল রয়েছে। কামার, কুমার, কুটিরশিল্পী ও তাঁতিদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাজ করলেও তাদের জীবনযাত্রার মান খুব বেশি এগোয়নি। “আমরা তাদেরকে ফান্ডিং সাপোর্ট থেকে শুরু করে স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ডিজাইন সাপোর্ট, ব্র্যান্ডিং থেকে করে একেবারে মার্কেটিং, অ্যামাজন, আলীবাবা প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই।” এসব পণ্যকে বাজারজাত করার যোগ্য পণ্য হিসেবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার ভাবনার কথা বলেন তিনি। শীতল পাটির উদাহরণ দিয়ে আমির খসরু বলেন, বরিশালে তিনি দেখেছেন একটি এলাকায় শীতল পাটি তৈরি হলেও পণ্যের নকশা, ব্র্যান্ডিং ও বাজার সংযোগের অভাবে উৎপাদকরা বেশি দাম পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “একটা ডিজাইনের ওপর একটা প্রোডাক্টের দাম তিন গুণ হয়ে যেতে পারে।” এ ক্ষেত্রে ‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণা আনার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো গ্রাম যদি শীতল পাটি তৈরি করে, তাহলে তাদের ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইনে সরাসরি বিক্রির সুযোগ দেওয়া যায়। থাইল্যান্ডে এ ধরনের উদ্যোগের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, সেখানে ঘরে বসে উৎপাদন হলেও সরকারি সহায়তায় পণ্য সংগ্রহ, প্যাকেজিং ও বৈশি^ক বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সরকার প্রকল্প নিতে পারলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে বেসরকারি খাত ও এনজিওর ভূমিকা জরুরি বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সরকার তো প্রজেক্ট করতে পারে, ডেলিভারি করতে পারে না, আনফরচুনেটলি। সো ডেলিভারি ইজ এ বিগ ইস্যু।” এ কারণে ‘ডেলিভারি’ নিশ্চিত করতে এনজিও ও বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৃজনশীল শিল্প, কুটিরশিল্প, থিয়েটার, সংগীত ও খেলাধুলাকেও অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। জিডিপি শুধু উৎপাদনশিল্পের ওপর নির্ভর করে না; সেবা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার অর্থনীতিও কর্মসংস্থান ও আয় সৃষ্টি করে। দেশের অর্থনীতিকে অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়, সরকারের একার বিষয়ও নয়; সবাইকে যুক্ত করতে হবে। “সকলকে ইনভলভ করতে হবে, সকলকে এটার সুযোগ, এটার সুফল পেতে হবে।”




