আন্তর্জাতিক

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হামলায় নিহত ১২

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এ ঘটনার পর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। সৌদি জোটের অভিযোগ, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতি গোষ্ঠী কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ হামলা চালিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হামলাটি চালানো হয়। সৌদি জোট এ ঘটনাকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। গত জুলাইয়ে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিনের সংঘাতের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সৌদি আরবে হুতিদের হামলা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ এ হামলার ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ওয়াশিংটন অংশ নিতে পারে। এক যাত্রী এএফপিকে জানিয়েছেন, তিনি বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ৪০৩ নম্বর গেটে ছিলাম। ৪০১ নম্বর গেটে আঘাত হানতে দেখেছি। নিজের চোখের সামনেই আহত মানুষদের দেখেছি। সবাই দৌড়াচ্ছিলেন।’ সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি, একজন মার্কিন নাগরিক, একজন মিসরীয়, একজন জর্ডানীয়, একজন সিরীয়, একজন ফিলিস্তিনি এবং একজন সুদানি রয়েছেন। আহত ৩০৯ জনের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এদিকে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় আহতদের চিকিৎসায় বিপুলসংখ্যক চিকিৎসককে জরুরি ভিত্তিতে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক চিকিৎসা সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এএফপিকে দুই চিকিৎসক জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে মক্কাগামী কয়েকজন হজযাত্রীও রয়েছেন।
‘যুদ্ধাপরাধ’ বলছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট
হামলার পর বিভিন্ন দেশের দূতাবাস সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজ নিজ নাগরিকদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি বেসামরিক স্থাপনায় এ হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসী হুতি মিলিশিয়াদের কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলায় বেসামরিক যাত্রী ও বিমানবন্দরের কর্মীরা নিহত ও আহত হয়েছেন। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ।’ এর আগে সৌদি জোট জানিয়েছিল, সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত কয়েকটি স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুতিরা। ওই হামলায় তিনজন নিহত হন এবং একটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে শনিবারের নতুন হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি গোষ্ঠীটি। ২০১৫ সালের মে মাসের পর সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। ওই সময় দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় কাতিফ প্রদেশের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২১ জন নিহত হন। হামলাটির দায় নিয়েছিল জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
-হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযানে যুক্ত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-
গত জুলাইয়ে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া চার বছর মেয়াদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ নতুন করে তীব্র হয়েছে। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাত পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের সরকারকে সামরিকভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট। প্রতিবেশী দরিদ্র দেশটির সংঘাতে সৌদি আরব ক্রমেই আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
শনিবার হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যোগ দিতে পারি।’ সৌদি আরবে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, হুতিদের মোকাবিলায় সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি আরব এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদন করলেও ওয়াশিংটন তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি ও স্পেনের দূতাবাসও তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। এএফপিকে এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, কয়েকটি দূতাবাস আগামী এক সপ্তাহের জন্য তাদের কর্মীদের ওই বিমানবন্দর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি মেট্রো স্টেশনের পাশে লাগেজ হাতে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে সংঘাত তীব্র
সৌদি আরবের সর্বশেষ এ হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন চলতি মাসে দেশটিতে বড় ধরনের সম্মেলন ও বিনোদনমূলক আয়োজনের মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। রিয়াদে সাধারণত সারা বছর নানা আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে বিদেশি রাষ্ট্রনেতা ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলনও রয়েছে। এদিকে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী গত মাসে হুতিদের দখলে যাওয়া বাব আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশের এলাকাগুলো পুনর্দখলে অগ্রসর হচ্ছে বলে এএফপিকে জানিয়েছেন সামরিক সূত্রগুলো। গত সপ্তাহে ইয়েমেন সরকার হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্যে পাল্টা অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। হুতিরা জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দাব এলাকায় হামলা চালিয়েছে। তবে তাদের দাবি, সেই হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। লোহিত সাগরে তেল ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালী। এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তবে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর পাল্টাপাল্টি দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থল পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারও সীমিত। আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক আনা জ্যাকব মনে করেন, সাম্প্রতিক হামলার জবাবে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় নিশ্চিত-আমরা অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে সংঘাতের আরও উচ্চতর পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!