জাতীয়প্রধান খবর

জ্বালানি ঘাটতি নেই, চাহিদার চেয়ে মজুত বেশি: জ্বালানিমন্ত্রী

দেশে বর্তমানে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, বরং সম্ভাব্য চাহিদার চেয়েও সরকারের বেশি প্রস্তুতি ও মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে এ কথা জানান। জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, অযথা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় ও মজুত করার কারণেই মূলত বাজারে একটি কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে। জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ দূর করতে এই বিবৃতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতের সাথে আমাদের অর্থনীতি, স্থিতিশীলতা, দৈনন্দিন জীবন ও উৎপাদন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে জড়িত। বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মজুত ও অগ্রিম প্রস্তুতির বিষয়টি দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা জরুরি মনে করেছি। আন্তর্জাতিক সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ চাপের মুখে থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে আমরা সঠিক এবং সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিয়েছি। দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। গত বছরের তুলনায় সরবরাহ আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দিন (১৭ ফেব্রুয়ারি) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। আজ (গতকাল সোমবার) মজুত আছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এই ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। বিপুল সরবরাহের পরও মজুত বৃদ্ধি প্রমাণ করে, সরকার আগাম প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সুদৃঢ় রেখেছে। পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত আরও বাড়ানোর কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, গত বছরের মার্চ মাসের চাহিদাকে ভিত্তি ধরে এবার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। জনমনে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, গত বছর মার্চে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন, অকটেন ১ হাজার ২০০ এবং পেট্রোল ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। অথচ চলতি বছরের ১ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন (দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন)। তেজগাঁওয়ের একটি পেট্রোল পাম্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সেখানে গত বছরের চেয়ে অকটেন বিক্রি প্রায় ৯৬ শতাংশ বেড়েছে। মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৫ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, অকটেন (৬.৮%) ও পেট্রোলের (৬.৭৭%) জন্য ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সঠিক চিত্র নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহের প্রবণতায় এই সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি হয়েছে। এ সংকট উত্তরণে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান চালিয়ে ১৫৩টি মামলা, ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি। এপ্রিলে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উদ্যোগ এবং দেশীয় উৎস থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন পাওয়ার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারের মজুতে আরও দুই মাসের চাহিদা অনায়াসে পূরণ হবে। জ্বালানি খাতে সরকারের বিশাল ভর্তুকির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, মার্চ-জুন প্রান্তিকে ডিজেল ও অকটেনে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি এবং এলএনজি আমদানিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। বৈশ্বিক সংকটেও দেশের পরিবহন, শিক্ষা ও শিল্পকারখানা সচল রাখার চেষ্টার কথা তুলে ধরে তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন। সীমান্তে পাচার রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, সবাই মিলে সাশ্রয়ী ও সচেতন হলে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযত হওয়া এখন সময়ের দাবি। আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। ব্যক্তি নয়, দেশ; অপচয় নয়, সাশ্রয়; বিভক্তি নয়, ঐক্য- সবার আগে বাংলাদেশ।
সারাদেশে অভিযানে ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার: সম্প্রতি সারাদেশে অভিযান পরিচালনা করে ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, মজুত প্রবণতা থাকায় সংকট কৃত্তিমভাবে তৈরি হয়েছে। সরকার সচেতনতা তৈরি করছে। দেশব্যাপী ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করে ১৫৩টি মামলাসহ ৭৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তেল মজুত করায় ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ১ লাখ ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ২২ হাজার লিটার অকটেন ও ২৩ হাজার লিটার পেট্রোলসহ মোট ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি অধিবেশনে একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে মার্চ-জুন প্রান্তিকে মোট ভর্তুকির প্রয়োজন হবে- ডিজেলের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা ও অকটেনের ক্ষেত্রে ৬৩৬ কোটি টাকা। মোট ভর্তুকি হবে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া পেট্রোবাংলার মাধ্যমে এলএনজি আমদানি এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, সরকার বিশ্বাস করে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কৃষি উৎপাদন, পরিবহন খরচ, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, একটা বাস্তবতা জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। দেশে ডিজেলের বর্তমান বিক্রয় মূল্য প্রতি লিটার ১০০ টাকা, অথচ প্রকৃত ব্যয় প্রতি লিটারে ১৯০ টাকা। এভাবে দেশে অকটেনের বর্তমান বিক্রয় মূল্য ১২০ টাকা, অথচ প্রকৃত ব্যয় ১৫০ টাকা ৭২ পয়সা। বিশ্বে জ্বালানি সংকটে বহু দেশ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা পর্যন্ত সীমিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি জীবনযাত্রা সচল রাখতে। মন্ত্রী বলেন, আমাদের পরিবহন, শিক্ষা কার্যক্রম, শিল্প কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি উৎপাদন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। আমরা এই গতি বজায় রাখতে চাই। এজন্যই জনগণের সহযোগিতা আজ আমাদের অত্যন্ত জরুরি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার মনে করে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!