আ. লীগকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সরকারের নেই: তথ্য উপদেষ্টা

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক বা দলীয় অংশগ্রহণ থাকছে না। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত বা এনসিপিÑ কেউই দল হিসেবে এতে অংশ নিচ্ছে না। আওয়ামীলীগকে কোনো ধরনের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সরকারের নেই। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এবং ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ পুনর্বাসন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গতকাল মঙ্গলবার তিনি এসব কথা বলেন। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চেয়ারম্যান বা মেয়র পদে দলীয় প্রতীক চালু করা হয়েছিল। এখন সেটি তুলে দেওয়া হয়েছে এবং আগের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়েছে। ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কর্মসূচি যতদিন নিষিদ্ধ থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগ, রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, তৃণমূল আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো নামে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা যাবে না। সরকারের এই ধরনের কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা নেই।
শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করার আহ্বান: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। তাই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তার বক্তব্য সরাসরি প্রচার করা উচিত নয়। এনডিটিভিকে দেওয়া শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার দেশের কিছু গণমাধ্যমে প্রচার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, অনেক মিডিয়া এই কাজ করছে। তারা আদালতের নির্দেশনা মানছেন না। এটা একটা বাস্তবতা। তথ্য মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে গণমাধ্যমকে আহ্বান জানাচ্ছে, তারা যেন এই কাজটি না করেন। প্রয়োজনে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবেও জানানো হবে। তিনি বলেন, এই বিষয়ে সরকার এখনই খুব কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে না। কিন্তু গণমাধ্যমের আইন ও আদালতের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। তথ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, বিদেশি গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ হলে মানুষ নানা মাধ্যমে সেটি জেনে যায়। তবু আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় দেশের গণমাধ্যমে তা প্রচার অনুচিত।
রাষ্ট্রের স্বার্থেই চীন-সংযোগ ও তিস্তা প্রকল্পে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ: চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য কানেক্টিভিটি (সংযোগ) প্রকল্প কিংবা তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বাংলাদেশ কেবল রাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো দেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের জাতীয় স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেবে। চীনের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক সংযোগ (কানেক্টিভিটি) নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বিশ্বে কানেক্টিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে যেকোনো সংযোগ প্রকল্পই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করেই হতে হবে। মিয়ানমার হয়ে সম্ভাব্য করিডোরের বিষয়টি এখনো বিভিন্ন দিক থেকে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, অতীতে চীন-মিয়ানমার- বাংলাদেশ-ভারতকে নিয়ে যেমন সংযোগের আলোচনা হয়েছিল, তেমনি বিবিআইএনের (বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল) মতো বহুপক্ষীয় উদ্যোগও রয়েছে। বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় সংযোগ বৃদ্ধিতে আগ্রহী। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, আগে চীনের প্রস্তাবে মূল গুরুত্ব ছিল নদীশাসন, ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ ও ভূমি পুনরুদ্ধারে। তবে বর্তমান সরকার প্রকল্পটিকে আরও বিস্তৃত আকারে ভাবছে। তিনি জানান, নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলায় নতুন ব্যারাজ নির্মাণ এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের বিষয়টিও পরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে। এতে কৃষি ও সেচব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, কোনো ব্যারাজ নির্মাণের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি থেকে সরে আসছে। সরকার তিস্তা ও গঙ্গাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদও চলতি বছর শেষ হচ্ছে। নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে। তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের সম্ভাব্য উদ্বেগের বিষয় নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে অন্য দেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলোকেও সম্মান করবে। তিনি বলেন, চীনের নদী ও বাঁধ নির্মাণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা রয়েছে। তবে এখনো প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আপাতত কারিগরি ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অতীতে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে কিছু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়। তথ্য কমিশন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, নতুন তথ্য কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে খুব শিগগিরই কমিশন গঠন করা হবে। তিনি বলেন, গণমাধ্যম কমিশন গঠনের কাজও এগোচ্ছে। আগের কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নতুন করে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজনের পর কমিশন গঠন করা হবে। ‘শিখা অনির্বাণ’ নিভিয়ে রাখা হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে এমন প্রচারণা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এ ধরনের দাবির কোনো প্রামাণ্য নথি নেই। এটি অপপ্রচার বলেই সরকারের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। কোনো তথ্যের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে তাকেই যিনি দাবি করছেন। ভিত্তিহীন প্রচারণাকে গুরুত্ব দিলে এ ধরনের অপপ্রচার আরও বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করবে: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে সরকার কোনো বাধা দেবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তদন্ত করবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ১২ হাজার কোটি টাকার সেবাখাতে দুর্নীতির হিসাব এবং এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দুর্নীতির দায় শুধু রাজনৈতিক সরকারের নয়, রাষ্ট্রের স্থায়ী অংশ অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদেরও রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন উভয় অংশই থাকে। সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে যে দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে, তা দীর্ঘদিনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা। ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এমন দাবি তারা করছেন না। তবে দুর্নীতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আগামী বছরের টিআইবির প্রতিবেদনে দুর্নীতির পরিমাণ কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা নিজেরা ওই ১২ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন দাবি করা ঠিক হবে না। তবে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুষ ও অনিয়মের সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে, যা দূর করতে সরকার কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, দুর্নীতি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এর কোনো তামাদি নেই। তাই যেকোনো সময় অভিযোগের তদন্ত করা সম্ভব। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন একটি স্বাধীন কমিশন। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উপদেষ্টা, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের কেউ কিংবা বর্তমান সরকারের কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে দুদকের উচিত স্বাধীনভাবে তদন্ত করা। সরকার এ ধরনের তদন্তে কোনো বাধা দেবে না বরং কমিশনের স্বাধীন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করবে। ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দুদকের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে অভিযোগ যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। সরকার চায়, অতীত ও বর্তমান সব সময়ের দুর্নীতির অভিযোগ সমানভাবে তদন্তের আওতায় আসুক।
কালেমা লেখা পতাকা উত্তোলনের পেছনের পরিকল্পনা খতিয়ে দেখছে সরকার: দেশের বিভিন্ন স্থানে আরবিতে কালেমা লেখা পতাকা উত্তোলনের পেছনের পরিকল্পনা সরকার খতিয়ে দেখছে বলে জানান ডা. জাহেদ উর রহমান। দেশের বিভিন্ন স্থানে আরবিতে কালেমা লেখা পতাকা উত্তোলনের বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উপদেষ্টা বলেন, খুব বিস্তারিত বলছি না, এইটা সরকার কগনিজেন্সে (আমলে নেওয়া) নিয়েছে, সরকার এটা দেখেছে। এটার সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক থাকার কোনো কারণ নেই। বরং এটা সরকার খতিয়ে দেখছে এবং সেটা কেন হচ্ছে। কারণ এটা নিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুল বার্তা যাওয়ার সম্ভাবনা (আশঙ্কা) আছে গ্লোবালি, এ ব্যাপারে আমরা সচেতন আছি। তিনি বলেন, আমরা এটা নিয়ে ব্যবস্থা নিতে চাচ্ছি এবং আমি ব্যক্তিগতভাবেও এইটার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আমরা আশা করি এই জিনিসটা এভাবে কন্টিনিউ করবে না। এগুলো কারা করছে- জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, এগুলো তো বুঝতেই পারছেন, এটা কারা করছে, কেন করছে। কিছু মানুষকে আপনি দেখবেন সোশ্যাল মিডিয়াতে বলছে, কিন্তু তারাই তো আসলে হয়তো সবসময় মূল ব্যক্তি না। সো, এটা একটু খতিয়ে দেখার প্রশ্ন আছে। এটা যেহেতু এত ওয়াইডস্প্রেড (বিস্তৃতভাবে) হয়েছে, এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে, সেটাই আমরা খতিয়ে দেখছি এবং আমরা ইনশাআল্লাহ এটা বের করতে পারবো।



