আন্তর্জাতিক

আলবেনিয়ায় ফের সংঘর্ষ, পুলিশের কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় গত শনিবার নতুন করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। কয়েক দিন ধরে চলা সহিংস অস্থিরতার মধ্যে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে দেশটির পুলিশ। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের নিয়মিত সংঘর্ষ হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আবাসন উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতা থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে বৃহত্তর সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা বেশ কয়েকটি সরকারি ভবনে হামলা চালিয়েছেন। এ ঘটনায় কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। সংঘর্ষে ৩০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গত শনিবারের বিক্ষোভে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। অন্যদিকে, কিছু বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। আন্দোলনকর্মী সিদোরেলা ভাতনিকাজ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ রয়েছে।’ তিনি আন্দোলনকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দেন। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘এটি শুধু শিক্ষার্থীদের বিষয় নয়। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনও নয়। এটি অধিকার ও আইনের শাসনের পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবারের বিক্ষোভে ১৩ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নয়জন বিক্ষোভকারী, দুই সাংবাদিক ও তিন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। তবে এ হিসাবে মোট ১৪ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সংখ্যার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। আয়োজকেরা গতকাল রোববার গ্রিনিচ মান সময় ১২টা থেকে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। আলবেনিয়ার বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষ শনিবারের সমাবেশে যোগ দেন। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন, শিল্পী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বিক্ষোভের আগে অনেক দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। কয়েকটি দোকানের শাটারে সমর্থন জানিয়ে লেখা ছিল, ‘দোকানে হাত দেবেন না, আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে সমাবেশ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল বিক্ষোভকারী ভবনটিতে পাথর নিক্ষেপ করেন। এর আগের দিনগুলোতেও ভবনটির অনেক জানালা ভাঙচুর করা হয়েছিল বলে এএফপির এক প্রতিবেদক জানিয়েছেন। পরে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। প্রথম বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থী রোজেলা মিরা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা এখানে একটি কারণে এসেছি। আমরা নিজেদের দেশেই থাকতে চাই, অন্য কোথাও জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখতে চাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখানেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চাই।’ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বোন শিক্ষার পরিবেশের অবনতির কথা তুলে ধরেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের এই শিক্ষার্থী আরও জানান, তাদের স্কুলে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং সেখানে পরীক্ষাগারের মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে কমিউনিজমের পতনের পর থেকে আলবেনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন ১৫ লাখের বেশি মানুষ। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। আলবেনিয়ায় কর দেওয়ার আগের গড় মাসিক বেতন ৯৩০ ইউরো, যা প্রায় ১ হাজার ২৬ মার্কিন ডলারের সমান। বিশ^বিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাবিওলা নিকাজ বলেন, ‘বাবা-মাকে সহায়তা করতে আমাদের একাধিক কাজ করতে হয়। তারা খুবই সামান্য পেনশন পান।’ বিক্ষোভে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বহন করা ব্যানারে লেখা ছিল, ‘সহিংসতা নয়’, ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘গণতন্ত্র বিপন্ন’। দুর্নীতি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে ১৮২টি দেশের মধ্যে আলবেনিয়ার অবস্থান ৯১তম। ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গত মে মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, প্রকল্পটির কারণে আলবেনিয়ার উপকূলের একসময়কার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি এলাকায় ইতিমধ্যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। পরে ওই প্রকল্প ঘিরে ক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়েছে। রামা সহিংসতার জন্য ‘বিদেশি শক্তিকে’ দায়ী করেছেন। পাশাপাশি অনলাইনে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর পেছনে রাশিয়া ও ইরানের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে সমাজতান্ত্রিক এই প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে আলোচনার আহ্বানও জানিয়েছেন। গত শনিবার সরকারের সদর দপ্তরের বাইরে সংলাপের প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে একটি অস্থায়ী কংক্রিটের টেবিলের চারপাশে লাল কুশন রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আলোচনার জন্য কেউ উপস্থিত হননি। পরে শত শত বিক্ষোভকারী কুশনগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেন। বিক্ষোভকারীরা নিজেদের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেছেন। তাদের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী রামা ও দীর্ঘদিনের বিরোধী নেতা সালি বেরিশা- উভয়ের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। গত শনিবার বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, ‘রামাকে কারাগারে পাঠাও’ এবং ‘বেরিশাকে কারাগারে পাঠাও’। তাদের অভিযোগ, বর্তমান সংকটের জন্য পুরো রাজনৈতিক শ্রেণিই দায়ী। এর আগে প্রধানমন্ত্রী রামা প্রায় ৪০ জনের ছবি প্রকাশ করেন। তাদের নামের পরিবর্তে আদ্যক্ষর উল্লেখ করে তিনি সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। একই সঙ্গে কয়েক ডজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে পদত্যাগের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!