যান্ত্রিক ত্রুটি আর গ্যাস সংকটে বার বার বন্ধ হচ্ছে যমুনা সারকারখানা
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্রতি মাসে গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হয় ৬ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা সার কারখানায় গ্যাস সংকটের কারনে বন্ধ হয়ে গেছে সার উৎপাদন কার্যক্রম। যান্ত্রিক ত্রুটি, গ্যাস সংকটসহ নানা সমস্যায় বার বার সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে এই কারখানার উপর নির্ভরশীল ড্রাইভার, শ্রমিক-কর্মচারী এবং ব্যবসায়ীরা। কারখানায় সার উৎপাদন বন্ধ থাকলেও যন্ত্রাংশ সচল রাখতে প্রতি মাসে শুধু গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হয় ৬ কোটি টাকা। আর কারখানা কর্তৃপক্ষ গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, রমজানের পর গ্যাস সংযোগ পেলে কারখানা চালু করা সম্ভব হবে।
দৈনিক ১৭শ’ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৯১ সালে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে জামালপুরের যমুনা সার কারখানা। বিসিআইসির তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৯শ’ ডিলারের মাধ্যমে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের কমান্ড এরিয়ার ২১ জেলার ১৬২ উপজেলায় কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ করে আসছে যমুনা সার কারখানা।

নিরবচ্ছিন্ন সার উৎপাদনের জন্য কারখানায় দৈনিক ৪২-৪৩ পিএসআই গ্যাসের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে গ্যাসের চাপ স্বল্পতা এবং কারখানার বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে সার উৎপাদন নেমে আসে ১২শ’ মেট্রিক টনে। ২০২৪ সালের জানুয়ারী মাসে গ্যাসের চাপ কম থাকায় যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ২৩ মাস কারখানা বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবারো উৎপাদনে ফিরে কারখানাটি। তবে কারখানাটি চালু হলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ও গ্যাস সংকটের কারনে এই তিন মাসে তিনবার বন্ধ হয়ে আবারো উৎপাদনে ফিরে। সবশেষ চলতি মাসের ১৭ তারিখ তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলে আবারো যমুনা সারকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
কারখানার তথ্য অনুযায়ী, যমুনা সার কারখানায় সবচেয়ে কম গ্যাস লাগে এবং এক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করতে খরচ হয় ১৮-২০ হাজার টাকা। আর দেশের বাইরে থেকে সার আমদানি করতে খরচ পড়ে টন প্রতি প্রায় এক লাখ টাকা। যমুনা সারকারখানায় দৈনিক ১৩শ’ থেকে ১৪শ’ মেট্রিক টন সার উৎপাদন করা যায়, এই পরিমান সারের বাজার মূল্য ৬ থেকে সাড়ে ৬ কোটি টাকা।
নিয়মিত সার উৎপাদন করা গেলে প্রতিদিন ৩ কোটি টাকার গ্যাস বিলসহ অন্যান্য খরচ পরিশোধ করেও সরকারের দৈনিক ২ কোটি টাকা লাভ হয়। কিন্তু কারখানার প্রিজারভেশন ঠিক রাখতে কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্রয়লার, পাওয়ার প্লান্টসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ সচল রাখতে প্রতিমাসে ৬ কোটি টাকার উপরে গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হয়, যা পুরোটাই কারখানার লোকসান। অথচ যমুনা সারকারখানা চালু থাকলে এই খরচ হতো না। এই অবস্থা আরো দীর্ঘস্থায়ী হলে কারখানাটির অধিকাংশ যন্ত্রাংশই অকেজো হয়ে পড়বে, নষ্ট যন্ত্রাংশ পুন:রায় স্থাপন করতে সরকারকে ব্যয় করতে হবে শত শত কোটি টাকা।

এদিকে কারখানাটি বার বার বন্ধ থাকায় কর্মহীন অবস্থায় বেকার হয়ে পড়েছে কারখানা সংশ্লিষ্ট অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারী, পরিবহনের চালক-হেলপার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অন্তত চার হাজার কর্মজীবী মানুষ। এছাড়াও গুণগত মানের দিক থেকে যমুনা সার কারখানায় উৎপাদিত দানাদার ইউরিয়া সার ফসলের জন্য ভালো হওয়ায় কৃষকদের কাছে এর চাহিদাও ব্যাপক। সেই সাথে উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইউরিয়া সারের দাম বৃদ্ধিরও সম্ভবনা রয়েছে। আর কারখানা এলাকায় অলস পড়ে রয়েছে শত শত ট্রাক।
যমুনা সার কারখানার সিবিএ সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনা সারকারখানা একটি ক্যামিকেল সমৃদ্ধ কারখানা, এখানে গ্যাস সংকটে বার বার কারখানা বন্ধ থাকলে বিভিন্ন যন্ত্রাংশে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়াও এই কারখানার উপর নির্ভরশীল বহু কর্মচারী, শ্রমিক, চালক, ব্যবসায়ী বেকার হয়ে পড়ে।
যমুনা সার কারখানার বিভাগীয় প্রধান (অ্যামোনিয়া ও ইউটিলিটি) মো: ফজলুল হক যান্ত্রিক ত্রুটি ও গ্যাস সংকটের কারনে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, দীর্ঘ ২৩ মাস পর গেলো নভেম্বরে গ্যাস সংযোগ পেয়ে সার উৎপাদন শুরু করা হয়। তবে একাধিকবার গ্যাস সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটিতে কারখানাটি বন্ধ থাকে। চলতি মাসের ১৭ তারিখে তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলে সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তবে রোজার পর আবারো উৎপাদনে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, কারখানা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে প্রিজারভেশন টিকিয়ে রাখা কষ্ট সাধ্য হয়, কারন প্রিজারভেশন না থাকলে প্লান্ট ডেমেজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই সব সময় চেষ্টা করি কারখানাটি সচল রাখতে।
সকল সংকট আর শঙ্কা কাটিয়ে দ্রুতই উৎপাদনে ফিরবে যমুনা সার কারখানা এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।




