সারাদেশ

রুমমেটকে হত্যার পর লাশের টুকরো ফেলা হয় পাঁচ স্থানে: পুলিশ

‘ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও বিত-ার জেরে’ রুমমেটকে হত্যার পর লাশ টুকরো করে শহরের পাঁচটি স্থানে ফেলে দেন যুবক, এরপর স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনের মত চলে যান কাজে। শাহীন আলম নামের ওই যুবককে তার কর্মস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা গেলেও নিহতের লাশের পুরো অংশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত শুক্রবার রাতে নয় পল্টনে আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে একটি কাটা পা উদ্ধার করে পুলিশ। গত শনিবার সকালে বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে দুটি হাত ও পরে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আরেকটি পা উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে হাতের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে পুলিশ জানতে পারে, দেহের খ-িত অংশগুলো ৩০ বছর বয়সী ওবায়দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তির। তার বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরে। তিনি একটি হোমিও প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সিসিটিভি ভিডিও পর্যালোচনা করে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গত শনিবারই মতিঝিলের হীরাঝিল হোটেলের কর্মচারী ২১ বছর বয়সী শাহীন আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেখিয়ে দেওয়া জায়গা থেকে নিহতের মাথাটি উদ্ধার করা হলেও এখনো শরীরের পুরো অংশটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানাতে গতকাল রোববার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি বলেন, “ওবায়দুল্লাহকে হত্যার পর নিজে বাঁচার জন্য লাশটাকে বিভিন্ন অংশে খ- করে। একটি পা নয়া পল্টনের আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীতে, দুটি হাত ফেলেছিল বায়তুল মোকাররমের একটি গেটের পাশে, একটি পা ফেলেছিল আপনার কমলাপুর রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকাতে। “মাথাটা ফেলেছিল কমলাপুরে ময়লা বোঝাই কন্টেইনারে। তার তথ্যের ভিত্তিতে আমরা কন্টেইনারে খোঁজ করে না পেয়ে পরবর্তীতে যখন জানতে পারি কন্টেইনারটা যাত্রাবাড়ী মাতুয়াইলে নিয়ে গেছে। পরে সেখানে খোঁজাখুলি খোঁজাখুঁজি করে আমরা খন্ডিত মাথা উদ্ধার করি।” জিজ্ঞাসাবাদে শাহীন বলেছে, শরীরের বাকি অংশ আটিবাজারে আলিপুর ব্রিজ থেকে ফেলেছে। সেখানে অভিযান চালিয়ে একটি অংশ পাওয়া গেলেও আরেকটি অংশের খোঁজ চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। পুলিশ বলছে, শাহীন আলম তিন মাস আগে হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে গুলিস্তানের একটি হোটেলে কাজ নেন। সেখানে ২০ দিন কাজ করার পর বেতন কম হওয়ায় সে চাকরিটি ছেড়ে দেয়। এরপর বাল্যবন্ধু মারুফের সঙ্গে কমলাপুরের একটি বাসায় ওঠেন। মারুফ হবিগঞ্জে চলে গেলে শাহীন গত দুই মাস ধরে ওবায়দুল্লাহর সাথে জসীমউদ্দিন রোডে একটি ছয়তলার বাসায় থাকা শুরু করেন। পরবর্তীতে সে ‘হীরাঝিল হোটেলে’ কাজ শুরু করে। কেন এই হত্যা? জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে গত শুক্রবার শাহীন নিজের কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে ওবায়দুল্লাহ ফোন করে সিগারেট আনতে বলে। সে সময় শাহীন বলেছিল তার কাছে সিগারেট কেনার মত পর্যাপ্ত টাকা নেই। বাসায় চলে আসার পরে ওবায়দুল্লাহ টাকা দিয়ে আবার শাহীনকে সিগারেট আনতে পাঠায়। কিছুক্ষণ পরে আবার শাহীনকে নান রুটি এবং কাবাব আনার জন্য আবার বাইরে পাঠায় ওবায়দুল্লাহ। রমজান মাসে ইফতারের পর ছয়তলা থেকে বারবার ওঠানামায় শাহীনের বিরক্তি তৈরি হয় জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, “শাহীন ঘুমানোর চেষ্টা করলে ওবায়দুল্লাহ উচ্চস্বরে ফোনে কথা বলা শুরু করে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। শাহীনের মা বাবাকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করে। তাছাড়া ওবায়দুল্লাহর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া অনৈতিক প্রস্তাবে শাহীন আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল।” পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, “ওবায়দুল্লাহ কাপড় ধোয়ার জন্য গোসলখানায় গেলে শাহীন রান্নাঘর থেকে চাপাতি এনে হত্যা করে। পরে লাশটি কয়েক টুকরো করে পলিথিনে ভরে ফেলে দেয়। একটি সিসিটিভি ভিডিওতে সাইকেলে চড়ে এসে রাতে খ-িত পা ফেলার দৃশ্য দেখতে পেয়ে শাহীনকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ। এছাড়া তার বাসা থেকে সাইকেল এবং হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতিটিও উদ্ধারের তথ্য দেন তিনি। আঁটিবাজারে শরীরের যে অংশটি ফেলা হয় সেটি সে সকালে সিএনজিতে করে নিয়ে গিয়েছিল জানিয়ে উপকমিশনার হারুন বলেন, “সিএনজি ড্রাইভার জিজ্ঞেস করেছে বালতিতে কি আছে? এখানে দুইটা খণবড ছিল, একটা বালতিতে এবং আরেকটা গামছাতে মোড়ানো ছিল। তখন সে বলেছে, এখানে বিষাক্ত কেমিক্যাল আছে। যে কোনো জায়গায় ফেলা যায় না। এটা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছে এবং যখন সে জায়গাটা সেইফ মনে করেছে সেখানে ফেলেছে। পরবর্তীতে সিএনজি ড্রাইভারও তাকে শনাক্ত করেছে।” এক প্রশ্নের জবাবে উপকমিশনার হারুন বলেন, শাহীনের ইতোপূর্বে কোনো অপরাধে সংশ্লিষ্টতার তথ্য তারা পাননি। “শুক্রবার রাত ১০ টার দিকে শাহীন ফোন করে তার হোটেল সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছিল, যে পরের দিন সকালের দিকে সে কাজে যাবে না। সেকেন্ড শিফটে যাবে। তো পরে যাবতীয় কার্যক্রম শেষে সে হোটেলে চলে যায়। হত্যা করার পরে সে খুবই স্বাভাবিক ছিল, যেন সে কোন অপরাধ করেনি। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে সে বিষয়টি স্বীকার করে।”

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!