লাইফস্টাইল

যেকোনও বয়সেই হতে পারে অ্যালার্জি, নেপথ্যে কী?

বিবিসির প্রতিবেদন

অ্যালার্জি সাধারণত শৈশবেই শুরু হয়-এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, জীবনের যেকোনও পর্যায়েই নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। এমনকি দীর্ঘদিন কোনও খাবার বা পরিবেশগত উপাদানে সমস্যা না থাকলেও প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে হঠাৎ সেটির বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধব্যবস্থা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ কেলি কোলাস বলেন, যেকোনও মানুষ জীবনের যেকোনও সময় নতুন কোনও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হতে পারেন। গবেষকেরা এখন মনে করছেন, এর পেছনে শুধু বংশগত কারণ নয়; বরং সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার পরিবর্তন, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য, হরমোনের ওঠানামা এবং কিছু ক্ষেত্রে পোকামাকড়ের কামড়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ফুড অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা রিসার্চের পরিচালক রুচি গুপ্তার মতে, কারও শরীরে অ্যালার্জির জিনগত প্রবণতা থাকলেও শুধু জিনই সবকিছু নির্ধারণ করে না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমন একটি ঘটনা প্রয়োজন হয়, যা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে অ্যালার্জির দিকে ঠেলে দেয়।

কোভিড-১৯ কি অ্যালার্জির ‘সুইচ’ চালু করতে পারে?
নতুন অ্যালার্জির সম্ভাব্য উদ্দীপক হিসেবে এখন কোভিড-১৯ নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস-সাধারণভাবে যাকে হে ফিভার বলা হয়-এবং হাঁপানির ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষণাটির সহলেখক ফিলিপ কারম্যান বলেন, সংক্রমণ অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়িয়েছে, আর টিকাদান সেই ঝুঁকি কমিয়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা, কোভিড-১৯-এর মতো সংক্রমণের সময় শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীরে প্রদাহ বাড়তে পারে। এই প্রদাহের কিছু ধরন অ্যালার্জিজনিত রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শিশুদের ক্ষেত্রে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) এবং সর্দি-জ্বরের জন্য দায়ী রাইনোভাইরাসের মতো ভাইরাসের সঙ্গেও পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জি দেখা দেওয়ার সম্পর্কের ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকেরা।
গুপ্তার ব্যাখ্যা, কোনও ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীর যখন তীব্রভাবে লড়াই করছে, ঠিক তখন খাবার বা পরিবেশের কোনও সাধারণ উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেটিকেও হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। ফলে এমন কোনও পদার্থের বিরুদ্ধেও প্রতিক্রিয়া শুরু হতে পারে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় ক্ষতিকর নয়।

অ্যান্টিবায়োটিকেও বদলাতে পারে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা
শুধু সংক্রমণ নয়, কোনও রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধও পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর অ্যালার্জির ঝুঁকি বাড়তে পারে-এমন সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তনের কথা বলছেন। মানুষের অন্ত্রে বিপুলসংখ্যক ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব বসবাস করে, যাদের সামগ্রিকভাবে মাইক্রোবায়োম বলা হয়। হজম, বিপাক এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী জীবাণুগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে মাইক্রোবায়োমের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমেও পরিবর্তন আসতে পারে।
গুপ্তার ভাষায়, এর ফলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় এক ধরনের ‘বিভ্রান্তি’ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সাধারণত নিরীহ কোনও পদার্থকেও শরীর ভুল করে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

গর্ভাবস্থা ও হরমোনের পরিবর্তনের প্রভাব
নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থাও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ওয়াশিংটন বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ কেলি কোলাসের মতে, আগে থেকেই পরিবেশগত অ্যালার্জি থাকা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারীর গর্ভধারণের পর উপসর্গ আরও বেড়ে যেতে পারে।
আবার এমন একটি অবস্থাও দেখা যায়, যাকে ‘প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিস’ বলা হয়। এতে আগে কখনও অ্যালার্জি না থাকা গর্ভবতী নারীরও হাঁচি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে এটি প্রকৃত অ্যালার্জি নয় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সন্তান জন্মের পর সাধারণত এসব উপসর্গ চলে যায়। হরমোনের ওঠানামার সঙ্গে এ অবস্থার সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
এস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো নারী প্রজনন হরমোন রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। মেনোপজের সময়ও হরমোনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এ সময়ও কিছু নারীর নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।

এঁটেল পোকার কামড়ে মাংসে অ্যালার্জি!
নতুন অ্যালার্জির সবচেয়ে অদ্ভুত উদাহরণগুলোর একটি হলো আলফা-গাল সিনড্রোম-যেখানে এঁটেল পোকার কামড়ের পর গরু, খাসি বা শূকরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংসে অ্যালার্জি তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের অ্যালার্জির সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত উত্তর আমেরিকার ‘লোন স্টার’ এঁটেল পোকা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই এঁটেল পোকার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ঘটছে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ^বিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক থমাস প্ল্যাটস-মিলস নিজেই এমন অ্যালার্জির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
২০০৭ সালে লন্ডনে এক সফরের সময় তিনি ভেড়ার মাংস খাওয়ার পর রাতে হঠাৎ সারা শরীরে চাকা ওঠার মতো অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার শিকার হন। এর কয়েক মাস আগে হাঁটার সময় লার্ভা পর্যায়ের এঁটেল পোকা তার শরীরে লেগে কামড় দিয়েছিল।
পরবর্তী রক্ত পরীক্ষায় তার শরীরে অ্যালার্জির সঙ্গে সম্পর্কিত অ্যান্টিবডির উচ্চমাত্রা পাওয়া যায়। তার নিজের অভিজ্ঞতা তার গবেষক দলকে এঁটেল পোকার কামড় ও মাংসে অ্যালার্জির মধ্যকার সম্পর্ক আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
এঁটেল পোকার লালায় আলফা-গাল নামের একটি শর্করা অণু থাকতে পারে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরে এটি স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের শরীরে এটি থাকে না। ফলে এঁটেল পোকার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে আলফা-গাল প্রবেশ করলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেটিকে বিদেশি উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে।
পরবর্তীতে কেউ গরু বা খাসির মাংস খেলে শরীরের ওই অ্যান্টিবডি আলফা-গালকে শনাক্ত করে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এতে চাকা ওঠা, শরীর ফুলে যাওয়া এবং পেটের অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে আলফা-গাল সিনড্রোমের শনাক্তকরণ দ্রুত বাড়ছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ এ সমস্যায় শনাক্ত হয়েছেন।

হঠাৎ হওয়া অ্যালার্জি কি পুরোপুরি ভালো করা যায়?
সব ধরনের নতুন অ্যালার্জি প্রতিরোধ বা পুরোপুরি সারিয়ে তোলার নিশ্চিত উপায় এখনও নেই। কোনও সংক্রমণ, এঁটেল পোকার কামড় বা অন্য কোনও কারণে একবার অ্যালার্জি তৈরি হলে সেটি অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
অ্যালার্জির মূল প্রক্রিয়াটি মোটামুটি একই। শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কোনও নিরীহ পদার্থকে ভুল করে বিপজ্জনক বিদেশি উপাদান হিসেবে শনাক্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে একই পদার্থ শরীরে প্রবেশ করলে প্রতিরোধব্যবস্থা আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এর ফলে নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, চোখ চুলকানো থেকে শুরু করে গুরুতর ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অ্যানাফাইল্যাক্সিসও হতে পারে।
তবে নতুন অ্যালার্জির সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যত বেশি জানতে পারছেন, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সম্ভাবনাও তত বাড়ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য রক্ষায় প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক, দই ও ফারমেন্টেড খাবার গ্রহণ সহায়ক হতে পারে বলে গুপ্তা মনে করেন। তবে এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
ভাইরাস সংক্রমণের সময় শরীরে অতিরিক্ত প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পরবর্তী সময়ে হাঁপানি বা অ্যালার্জির মতো জটিলতা কমানো সম্ভব কি না, সেটিও এখন গবেষণার বিষয়।

রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ‘প্রশিক্ষিত’ করার চেষ্টা
অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে তৈরি কিছু ওষুধ নিয়েও গবেষণা এগোচ্ছে। জোলএয়ার (ওমালিজুমাব)-এর মতো ওষুধ রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া কমাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। হাঁপানির চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর এটি খাবারে অ্যালার্জির কিছু প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এছাড়া গবেষকেরা এমন ভ্যাকসিন তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন, যা অ্যালার্জেনের প্রতি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া আরও নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। আরেক ধরনের পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় একবারের ডোজে সরাসরি অ্যালার্জেন-প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি শরীরে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে এসব গবেষণা এখনও অ্যালার্জি পুরোপুরি নির্মূল করার নিশ্চয়তা দেয় না। গুপ্তার মতে, নতুন অ্যালার্জি পুরোপুরি উল্টে দেওয়ার নিশ্চিত পদ্ধতি এখনও হাতে আসেনি। তবে গত দুই দশকে বিশেষ করে খাদ্য অ্যালার্জি নিয়ে গবেষণায় যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে ভবিষ্যৎ চিকিৎসা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!