জাতীয়প্রধান খবর

সব ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারির জন্য রুম স্থাপন না করলে লাইসেন্স বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালকে আগামী শনিবারের মধ্যে নরমাল ডেলিভারির জন্য বাধ্যতামূলকভাবে লেবার রুম স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লেবার রুম স্থাপন না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। গতকাল সোমবার রাজধানীতে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে এমন একটি মুনাফাকেন্দ্রিক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে, যারা মানুষের কল্যাণের চেয়ে অর্থ উপার্জনকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এর প্রভাব প্রসূতি সেবাতেও পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, একসময় দেশে অধিকাংশ সন্তানই স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিত। তখন আধুনিক ক্লিনিক বা সিজারিয়ান প্রসবের প্রচলন ছিল না। গ্রামাঞ্চলে প্রশিক্ষিত না হলেও অভিজ্ঞ ধাত্রীরা প্রসব করাতেন। সময়ের সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হয়েছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুযোগে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতাও বেড়েছে। মন্ত্রী বলেন, গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে শেষের দিকে রোগীদের অযথা ভয় দেখানো হয়। বিভিন্ন জটিলতার কথা বলে বলা হয়, অপারেশন না করলে মা কিংবা শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা ঝুঁকি নিতে চান না এবং সিজারিয়ান করাতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, আল্লাহর পরে মানুষের সবচেয়ে বড় অভিভাবক হচ্ছেন চিকিৎসক। তাই চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থাও অনেক বেশি। কিন্তু সেই জায়গায় নৈতিকতার ঘাটতি থাকলে রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমাতে হলে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে স্বাভাবিক প্রসবের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রতিটি ক্লিনিক ও হাসপাতালে লেবার রুম থাকা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি স্পষ্ট নির্দেশ দিচ্ছি, আগামী শনিবারের মধ্যে সব বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে লেবার রুম চালু করতে হবে। যারা এই নির্দেশনা মানবে না, তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি জেনেছেন, অনেক ক্ষেত্রে সিজারিয়ান প্রসবের পর নবজাতক জন্মের পরপরই মায়ের শালদুধ (কলোস্ট্রাম) পায় না। অথচ এই শালদুধই নবজাতকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির উৎস। তিনি বলেন, জন্মের পরপরই শালদুধ না পেলে শিশুর পুষ্টিগত ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে। এ ধরনের ঘাটতির কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমিয়ে স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করা এবং মা ও নবজাতকের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাকে বিএনপি হিসেবে ট্রিট করবেন না, একজন মানুষ হিসেবে দেখুন। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক ভালোবাসা দিয়ে আমার বিধবা মায়ের বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। মা আমাকে ছাড়তে চাইছিলেন না। আমি বলেছিলাম, আমরা যদি কেউ না যাই, তাহলে দেশটা স্বাধীন করবে কে? তিনি বলেন, মায়ের চোখের পানি মুছে যুদ্ধ করতে চলে গিয়েছিলাম। সেদিন ভাবিনি আর ঘরে ফিরতে পারব কি না। নয় মাস মায়ের সঙ্গে আমার কোনো দেখা হয়নি। ছয় মাস পর্যন্ত আমি কোথায় আছি, সেই খবরও তিনি জানতেন না। দেশকে ভালোবেসেই যুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম। বক্তব্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিবারের ভূমিকাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, যার পিতা এই দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। আমি মেজর জিয়ার কথা বলছি। তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি, যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিয়েছেন, সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে দেশকে স্বাধীন করতে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মা-ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি কোনো স্বৈরাচারের সঙ্গে আপস করেননি এবং সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আগের দিন এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রীদের উদ্দেশে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে একটি প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, আপনারা আমার কথা রাখতেও পারেন, নাও রাখতে পারেন। তবে আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে বলছি। আমার বাবা প্রতি মাসে তার বেতনের ১০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিতেন, যাতে গরিব মানুষের কল্যাণে বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তা ব্যয় করা যায়। নিজের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, আমিও বেতন নিচ্ছি। আমার বেসিক বেতন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এর ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ হাজার ৫০০ টাকা প্রতি মাসে বেতন অ্যাকাউন্টে আসার পর তুলে সরকারি হিসাবে জমা দিই।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!