জাতীয়

মিটার ভাড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে সরকার: বিদ্যুৎ সচিব

জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ ও জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়ে সরকার বলেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিল বৃদ্ধির কারণ নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বৃদ্ধি। তবে কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুল পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মিটার ভাড়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে সরকার। গতকাল সোমবার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ খাতের অগ্রাধিকার, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ, মিটার ভাড়া এবং জুন ২০২৬ মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিম উপস্থিত ছিলেন। মিরানা মাহরুখ বলেন, জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহকদের অভিযোগ সরকারের নজরে এসেছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে এবং অধিকাংশ অভিযোগ ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অবহেলা কিংবা গ্রাহক হয়রানির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জুন ২০২৬ থেকে নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফ কার্যকর হয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য আগের ট্যারিফ বহাল রাখা হয়েছে। অন্য গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ সহনীয় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ায় একই পরিমাণ অর্থ রিচার্জ করলে প্রিপেইড গ্রাহকরা আগের তুলনায় কম ইউনিট বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। ফলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং অনেক গ্রাহককে ঘন ঘন রিচার্জ করতে হচ্ছে। এতে অনেকের কাছে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হতে পারে। মিটারে কারিগরি ত্রুটির অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, যেসব মিটার আগে বিদ্যুৎ ব্যবহার সঠিকভাবে পরিমাপ করেছে, নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোতে হঠাৎ ত্রুটি দেখা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিল বৃদ্ধির জন্য মিটার নয়, নতুন ট্যারিফই দায়ী। তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ, তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত, ঈদুল আজহা, চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ এবং এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় ঘরে অবস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্যান, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় অনেক গ্রাহক উচ্চতর ট্যারিফ স্ল্যাবে চলে গেছেন। এতে বিল আরও বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুল ধরা পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেসব বিল পুনরায় যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হচ্ছে। অনেক গ্রাহক দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো কিছু কনটেন্ট নির্মাতাকেও নিয়মকানুন ব্যাখ্যা করে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, সিস্টেম লস কমানো এবং স্মার্ট ও প্রিপেইড মিটারের সম্প্রসারণে কাজ চলছে। মিটার ভাড়া প্রসঙ্গে জানানো হয়, ছয়টি বিতরণ সংস্থা গ্রাহকদের এককালীন মূল্য বা কিস্তিতে মিটার সরবরাহ করে। এককালীন মূল্য পরিশোধকারী গ্রাহকদের কোনো কিস্তি দিতে হয় না। কিস্তিতে সংযোগ নেওয়া গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল-ফেজ মিটারের জন্য মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ মিটারের জন্য ২৫০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। চারটি বিতরণ সংস্থা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকদের নিজ উদ্যোগে প্রিপেইড মিটার কেনার সুযোগও দিয়ে থাকে। গ্রাহকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মিটার ভাড়ার বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করছে। এ বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এ ছাড়া বিলম্ব মাশুলের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে মাসিক ২ শতাংশ হারে চক্রবৃদ্ধি বিলম্ব মাশুল আরোপ করা হলেও বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ বিলের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ বিলম্ব মাশুল আরোপ করা হচ্ছে। যেসব গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সন্দেহ বা অভিযোগ রয়েছে, তাদের সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রয়োজনে মিটার পরীক্ষা, বিল পুনঃযাচাই এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, জনগণের স্বার্থ রক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই করে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতাদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়। গুজব বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় প্ররোচিত হয়ে বিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতি না করার জন্যও নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

সম্পর্কিত প্রবন্ধ

Back to top button
error: Content is protected !!