rockland bd

মালেয়শিয়া ভ্রমন এবং কিছু অভিজ্ঞতা

0

মোঃ মোশফিকুর রহমান-


হঠাৎ মালেয়শিয়া ভ্রমনের সুযোগ হলো ক’দিন আগে। চাকরির ১০ বছরে দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতেই ভ্রমন করার সুযোগ হয়নি, সেখানে মালেয়শিয়া ভ্রমনের সংবাদ যথেষ্ট অবাক করে দিয়েছিল।

G/O order হাতে পাওয়ার পরপরই প্রিপারেশন। সময় স্বল্পতার কারনে তড়িঘড়ি করে পাসপোর্ট এর জটিলতা নিরসন করে ঢাকায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সালমা স্যারের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি দলে কারাগারের ডিআইজি টিপু সুলতানসহ আমরা বিভিন্ন পদবির ৯ জন কারা কর্মকর্তা ছিলাম।

আমাদের সরকারি ট্যুরের (স্টাডি ট্যূর) উদ্দেশ্য ছিল সুষ্ঠু কারা ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনার জন্য জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করা। তবে সে সুযোগে একটা অজানা দেশ, অজানা ভূখণ্ড সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার বা একটু ঘুরে দেখারও সুযোগ হয় আমাদের।

আমি আমার সীমিত জ্ঞানে হয়তো নিজের দেশের পরে সুন্দর দেশ হিসাবে ভাবতাম ইংল্যান্ড, আমেরিকা, নিউজিল্যান্ডসহ আরো কিছু দেশকে। মালেয়শিয়া নিয়ে কখনও সেরকম ভাবনায় আসেনি। এত সুন্দর, ঝকঝকে, পরিপাটি একটি দেশ হবে কখনও কল্পনা করিনি।

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার পথে বড়সড় ধাক্কা খেলাম। কোন জ্যাম নেই, রিক্সা নেই, ফুটপাতে হকার নেই, মানুষের চলাচল নেই। ৮ লেনের রাস্তায় প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস যার যার লেনে সারিবদ্ধ হয়ে সুন্দর এবং সুশৃঙ্খলভাবে গন্তব্যে চলছে। কোন হর্ন বাজছে না, কোন শব্দ দূষণ নেই, রাস্তার দুই ধারে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সারি সারি পাম গাছ আর ফাঁকে ফাঁকে দৃষ্টি নন্দন সরকারি স্থাপনা এবং একই ধাঁচের চমৎকার বসতবাড়ি আমাদের অভিভূত করেছে।

প্রথমে ভেবেছিলাম রাজধানী শহর বলেই হয়তোবা এমন মনে হচ্ছে। কিন্তু না, সাতদিনে যা দেখলাম তা আসলেই চমকে যাওয়ার মতই।

আমাদের দেশের রাস্তাঘাট, যানবাহন, জ্যাম, হকার, রিক্সা, টেম্পু, অটো, পাগলু, নছিমন, মহেন্দ্র, শব্দ দূষণ, অপরিচ্ছন্নতা, আবর্জনা ইত্যাদি নিয়ে আফসোসের শেষ নেই। অন্তত ঐ দেশে গিয়ে নিজের দেশের এমন চিত্র বারবার মনে পড়েছিল।

আর আফসোস করে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছি, ওরা এত গুছানো/পরিপাটি, আমরা নই কেন?

সাতদিনে যেখানেই গিয়েছি, গ্রাম কিংবা শহর একই চিত্র নজরে পড়েছে। প্রতিটি রাস্তা যেন দু’ দিন আগে নির্মান কাজ শেষ করেছে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে ৮/১০/১২ লেনের রাস্তাগুলো সত্যি অপূর্ব। আর যত দূরে যাই, শুধুই পামগাছ দেখি, তবে কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় ৫০০ কি:মি: দূরে লংকাবি (একটা দ্বীপ) যাওয়ার পথে একেবারে লংকাবির কাছাকাছি গিয়ে অবারিত ফসলের মাঠও দেখেছি। ধান চাষের প্রস্তুতি চলছে, প্লানমাফিক চাষ দেখলেই তা বুঝা যায়, সরকারি ব্যবস্থায় ক্যানেল আছে, চাহিদামত পানি সাপ্লাই থাকে। দু’চারটা গরুও চোখে পড়েছে।

ফলফলাদি গাছের খোঁজে মাঝেমধ্যে দু’ একটা ফলন্ত আম গাছ দেখলেও পরিচিত ফলের গাছ চোখে পড়েনি। বনায়নের দিক থেকে সেরকম নয়। অন্যান্য ফলের বাগানও দেখিনি।

তবে যেদিকে যাই প্রাণ জুড়িয়ে দেখি পাহাড়, পাম গাছ আর ঝকঝকে, পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ৮/১০/১২ লেনের রাস্তা আর সুন্দর সুন্দর ঘর-বাড়ী। যখন পাহাড়ের একদম বুক চিড়ে তৈরি রাস্তা ধরে গাড়ীতে যাচ্ছি, চোখে পড়ছে শক্ত পাথরের পাহাড়। মালেয়শিয়া সরকার কি নকশা করেই না করেছে এসব। মাহাথির মোহাম্মদ যে আধুনিক মালেয়শিয়ার জনক, কাছ থেকে তার সত্যতা দেখলাম। প্রতিটি কাজই চমৎকার প্ল্যানের বহিঃপ্রকাশ এবং অসাধারণ নেতৃত্বগুণের উপস্থিতি যা মুগ্ধ করেছে আমাদের।

যতটা জেনেছি ৬০% মালেয়শিয়ানদের দেশে ৪০% অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী, তাদের মধ্যে ২৩% এর মত চাইনিজরা আছে এবং তাদের অবদান অপরিসীম এই মালেয়শিয়া গঠনে। কিছু ইন্ডিয়ান আর কিছু বাঙালীও আছে। শুনেছি ইন্ডিয়ানরা বিশেষ করে কেরালার অধিবাসী উগ্র টাইপের। তাছাড়া মালয়েশিয়ানদের সম্পর্কে অলস টাইপ আর অপরাধ প্রবনও শুনেছি। তবে যা প্রশংসা করে শেষ করা যাবে না তা হলো ওদের রাজনীতি চর্চা।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধুই ব্যালটে। আমরা যখন মালেয়শিয়ায়, তখন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন একদম সন্নিকটে। আর ফিরে যেদিন আসি, তার দু’ দিন পরেই ছিল নির্বাচন। অথচ কোন দলকেই রাস্তায় ক্যানভাস, মিছিল, সভা, সমাবেশ করতে দেখিনি। কেউ ইচ্ছে করে খোঁজ-খবর না নিলে হয়তো বুঝতে পারবে না যে দেশে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন বা জেনারেল ইলেকশন চলছে।
এই বিষয়টি সত্যিই অবাক করে দিয়েছে আমাদের।

আর ট্যুরিস্টদের জন্য মালেয়শিয়া যথেষ্ট আকর্ষণীয়। দেশটি শুধু ঝকঝকে তকতকে নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং কৃত্রিম সৌন্দর্যের সংমিশ্রণে নান্দনিকতাকে হার মানিয়েছে। সেক্ষেত্রে রাজধানী কুয়ালালামপুরের আশেপাশেই রয়েছে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন স্পট। সুউচ্চ পেট্রোনাস টাওয়ারে(যাকে মালেয়শিয়ানরা টুইন টাওয়ার বলে) একটি সন্ধ্যা’ মধুময় হয়ে থাকবে।

গেনটিং হাইল্যান্ড মাত্র ৪৫ মিনিটের পথ। ৮০০০ ফুট উচু পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে রাস্তা এবং সুন্দর সুন্দর স্থাপনা সত্যি অসাধারণ। তাছাড়া গেনটিং হাইল্যান্ড যাওয়া আসার সময় রাস্তার দু’ধারের মনোমূগ্ধকর পরিবেশ মুগ্ধ করেছে আমাদের সবাইকে।

পুত্রজয়া হলো মালেয়শিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী। কুয়ালালামপুর থেকে মাত্র ২৫/৩০ কি:মি: দূরে অবস্থিত সবুজের সমারোহ এই শহর। বোটানিক্যাল গার্ডেন, পুত্রা মসজিদ আর প্রধানমন্ত্রীর অফিসভবন সহ চারিদিকের সৌন্দর্য মোহিত করেছে আমাদের।

মালেয়শিয়া যাবেন কিন্তু লংকাবাই এবং পেনাং যাবেন না, তা যেন না হয়। লংকাবাই হচ্ছে ভারত মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত শত দ্বীপে গঠিত একটি দ্বীপ। আকাশ, পাহাড় আর সাগরের অসাধারণ সংমিশ্রণ এই দ্বীপটি। আকাশ পথে গেলে মাত্র ঘন্টা খানেক সময় লাগবে আর মাইক্রোবাস যোগে গেলে ৪/৫ ঘন্টা সময় নিবে। আমরা বেছে নিয়েছি মাইক্রোবাস। কেননা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে কাছ থেকে উপভোগ করা।

সুন্দরের দেশ মালেয়শিয়া সব জায়গায় তার অনন্য সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে। লংকাবাই যাওয়ার পথে রাস্তার দুই ধার আর চারিদিক শুধু পাম ট্রি আর সবুজ পাহাড়ের অপরুপ সৌন্দর্য সত্যিই আপ্লুত করেছে আমাদের। বাস থেকে নেমে সমুদ্র পথে আরও ৪০/৫০ মিনিটের লঞ্চভ্রমন শেষে লংকাবাই। মনে হয়েছে একটি অন্য দেশ, অন্যরকম অনুভূতি। পাহাড়ের গায়ে নির্মিত হোটেলে রাত যাপন করে পরেরদিন লংকাবাই এর ম্যান গ্রোব, সান বিচ বা black sand beach, sky cab, cable car ইত্যাদি উপভোগ করে পেনাং ব্রীজ হয়ে যখন কুয়ালালামপুর ফিরছি, গাড়ীর জানালা দিয়ে দেখেছি সমুদ্রের মোহনায় নির্মিত ১৩ কি:মি: দৈর্ঘ্য পেনাং ব্রীজ, সাগড় আর পাহাড়ের সৌন্দর্যময় দৃশ্য। তবে সময় স্বল্পতার কারণে পেনাং সমুদ্র সৈকত উপভোগ করা হয়নি।

পরিশেষে বলবো পর্যটন নগরী মালেয়শিয়া তার সৌন্দর্যের ছোঁয়া সর্বত্রই বিস্তার করে রেখেছে। এ অল্প ক’টা দিনই মালেয়শিয়া ভ্রমনে দেশটি সম্পর্কে দারুন কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। খুব ভালো লেগেছে দেশটি।

লেখক : জেলার (ভারপ্রাপ্ত) পঞ্চগড় জেলা কারাগার

Comments are closed.