rockland bd

নীতি ও নীতিমালাহীন রাজনীতি

0

সহজ কথা যায় না বলা সহজে। কিন্তু আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সহজ কথা সহজভাবে বলে থাকেন সবসময়। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চ্যান্সলর হিসেবে দেওয়া বক্তৃতার জন্য, সময়ের সবচেয়ে আলোচিত চ্যান্সলর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম ও এবারের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সবটুকু আলো তিনি তাঁর অতিসরল বক্তৃতা দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বোরিং অংশটা হলো সমাবর্তন বক্তৃতা শোনা। আমি নিজে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত ৪৫তম সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করে ডিগ্রি নিয়েছি। আমাদের সময় সমাবর্তন বক্তা ছিলেন ১৯৮৬ সালে রসায়নে নোবেল বিজয়ী ইমেরিটাস অধ্যাপক ইউয়ান টি.লি।

মনে আছে, প্রধান বক্তার বক্তৃতা কোনমতে শুনে ছেড়ে দে মা কেঁন্দে বাঁচি অবস্থায় আমরা শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের খেলার মাঠ ত্যাগ করেছিলাম। তবে এক্ষেত্রে ৫০তম ও ৫১তম সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীরা ভাগ্যবান বলতে হবে। এই দুই সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সলর মো. আবদুল হামিদের বক্তৃতা সরাসরি শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।

৫০তম সমাবর্তনে তাঁর আলোচিত বক্তৃতার চুম্বক অংশ ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আসলাম ভর্তি হবার জন্য তখন ভর্তিতো দুরের কথা ভর্তির ফরমটা পর্যন্ত আমাকে দেওয়া হলো না। আল্লার কী লীলা খেলা বুঝলাম না, যে ইউনিভার্সিটিতে আমি ভর্তি হতে পারলাম না, সেই ইউনিভার্সিটিতে আমি চ্যান্সলর হয়ে আসছি।

আর এবারের ৫১তমর চুম্বক অংশ হলো, গরিবের বউ নাকি সবারই ভাউজ। এহন রাজনীতি হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো। এখানে যে-কেউ যেকোন সময় ঢুকে পড়তে পারে। কোন বাধা-বিঘ্ন নাই।

আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানান শিল্পপতি, ভগ্নিপতি, আমলা, বিভিন্ন পেশাজীবীদের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি কথাগুলো বলেছেন। দেশে চলমান নির্বাচনে এমপি পদপ্রার্থীদের প্রচারনার ধরণ যদি আপনি লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন হঠাৎ দলের কোন শাখা সংগঠনের সহ-সম্পাদক পদের অধিকারীদের গণসংযোগ আর নির্বাচনী মহড়ায় রাজনীতির চেনা মাঠ হঠাৎ উত্তাল।

আবার পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ এর মতো অনেক সাবেক আমলাও গণসংযোগ শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যমগুলোতে যে খবর আমরা পাচ্ছি তাতে দেখা যাচ্ছে, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০ থেকে ৭০ জন সাবেক আমলা নির্বচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য নমিনেশনর ইঁদুর দৌড়ে নামবেন।

জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের শরিক দল জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কাছে কিংবা যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্যের নেতারা বিএনপির কাছ থেকে এতোগুলো আসনের নমিনেশন দাবি করতে পারবে কিনা সন্দেহ।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি যাদের কথা বলেছেন, তারা নমিনেশন চাইতেই পারেন। সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, শিল্পপতিরা চাঁদা দেয়, আমলারা রাজপথ ফাঁকা রাখতে সাহায্য করে, পেশাজীবীরা নিজ পেশার মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য বাদ দিয়ে সারাজীবন দলের চাটুকারিতায় ব্যস্ত থাকে আর পরিবারতন্ত্রতো উপমাহাদেশের রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই যে বিশৃঙ্খলা তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাজনীতিতে নীতি ও নীতিমালার অভাব রয়েছে।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে সব সময় নীতির বড় অভাব পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণ হিসেবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথায় ধরা যাক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এক সময় আওয়ামী লীগ ও জামায়াত যুগপৎ আন্দোলন করেছে। ২৭ জুন, ১৯৯৪ সালে সংসদ ভবনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দলদু’টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই রূপরেখাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে ঘোষণা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।

যে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছিল তারাই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে আর যে বিএনপি এই ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা আজ তা পুনবহালের জন্য সংগ্রাম করছে।

আবার, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগসহ আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলো তৎকালীন স্বৈরাশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপাধি দিয়েছিল, বিশ্ব বেহায়া। সেই বিশ্ব বেহায়া স্বৈরাশাসক ও তার দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বগলদাবায় অবস্থান করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

স্বৈরাচার এরশাদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত আর তাঁর দল সংসদে কথিত অদ্ভূত গৃহপালিত বিরোধী দল। আবার বিএনপির বিরুদ্ধে যে জামায়াত এক সময় আওয়ামী লীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, তারা আজ বিএনপির সাথে মিলেমিশে একাকার, হরিহর আত্মা।
যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য, অন্যসব বাম-ডান, ছোট দল, ইসলামী দল সম্পর্কেও নীতিহীনতার হাজারও উদাহরণ দেওয়া যায়। সর্বশেষ, সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তাঁর দলকে বাদ দিয়ে যে নাটকিয়তার মধ্যদিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠিত হলো, তা থেকে রাজনীতিবীদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিবোধের গভীরতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা অমূলক নয়।

আমাদের সকলের হয়তো মনে আছে, গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলনের বিপরীতে হেফাজতে ইসলামী নাস্তিক প্রতিরোধে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছিল। সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহমদ শফী সম্প্রতি তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছেন, লোকে বলছে, আমি নাকি আওয়ামী লীগ হয়ে গেছি? আওয়ামী লীগ হলে ক্ষতি কী? আসলে নীতিহীনতা ও ডিগবাজি হলো আমাদের দেশে রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

আর যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সব ধরণের কমিটিতে পদ বানিজ্য এই সমস্যাকে প্রকট করে তোলে। বিত্তবান ও সুযোগ সন্ধানীরা সবসময় ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকতে চায়। আর রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিহীন রাজনীতি তাদেরকে স্বর্থ চরিতার্থ করার সুযোগ তৈরী করে দেয়। ফলে প্রকৃত ও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা ক্ষমতার মাঠে মার খায়।

স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে দেশে সব সময় কথা হয়। আমাদের ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিমানবন্দর দু’টিতে সারা বছর যে পরিমান স্বর্ণ ধরা পড়ে, অনেক স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশে একবছরে ঐ পরিমাণ স্বর্ণ উৎপাদন হয় না।

অনেকে মজা করে বলেন, এদু’টো বিমানবন্দর হলো আমাদের স্বর্ণ খনি। অনেক দিন পর দেশে স্বর্ণ নীতিমালা প্রনয়োণ করা হয়েছে। রাজনীতিরও নীতিমালা হওয়া খুব জরুরি। আমাদের দেশেও আমেরিকার মতো দলগুলোর নিবন্ধিত ভোটারের ভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও এমপি প্রার্থী বাছায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

নিয়ম করা জরুরী, রাশিয়ার মতো আমাদের দেশেও টানা দুই মেয়াদের বেশী কেউ প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি থাকতে পারবেন না। সবধরণের কমিটিতে নিবন্ধিত কর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটে কমিটি গঠন করতে হবে। একজন ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশী কোন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা অন্য পদে থাকতে পারবেন না।

সকল ধরনের কমিটির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম নির্ধারণ করতে হবে। একটা দলের ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে টানা দশ বছরের কম সদস্যপদ ধারীদের কোন ধরণের নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না।

নীতিমালা তৈরীর কাজ ইসিকেই করতে হবে। তারও আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সচ্ছ গণতন্ত্র চর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। হাত দেখিয়ে সভাপতি নির্বাচন করার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

ইসি, রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের অংশীজনদের সাথে আলাপ আলোচনা করে যদি দেশে রাজনীতির জন্য একটি নীতিমালা করতে পারে, তা হলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শৃঙ্খলা আসবে। আর রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা গণতন্ত্র চর্চা না করে যদি দেশে মুক্ত গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ আশা করে তা হবে, বোকার স্বর্গে বাস করা।

এই উপমহাদেশে একটি কমন সমস্যা হলো, আমরা ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে ভুলে যায়। ফলে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও কালপরিক্রমায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের রূপ ধারণ করে।

এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত নৈতিকতা ও গণতন্ত্র চর্চা পারে, আমাদের প্রকৃত মুক্তি দিতে। আমরা যেহেতু উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা নিয়ে উন্নত দেশ হওয়ার মহাসড়কে হাঁটা শুরু করেছি, তা শুরু করতে হবে এখনই।

Comments are closed.