rockland bd

হোয়াইট হেলমেট বনাম বাংলাদেশি হেলমেট

0
ওয়ারেছুন্নবী খন্দকার

ALEPPO, SYRIA – JULY 23: A civil defence worker carries a child through rubble as civil defense team members and the citizens try to rescue people who were trapped under the wreckage after the war-crafts belonging to the Russian army and Assad regime bombed the opposition controlled Firdevs neighborhood in Aleppo, Syria on July 23, 2016. (Photo by Ibrahim Ebu Leys/Anadolu Agency/Getty Images)

ওয়ারেছুন্নবী খন্দকার :  আকাশ থেকে পড়ছে বোমা, বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে বাড়ি-ঘর আর জ্যান্ত মানুষ। এই আক্রমণ ঠেকানোর উপায় নেই একদল মানুষের। মানবতার এমন পরাজয়ে তাই বলে তো চুপ করে থাকা যায় না। তারা ঘাপটি মেরে থাকে, লুকিয়ে থাকে। বোমা হামলার পর পরই ছুটে যায় ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে। তাদের সবার মাথায় সাদা হেলমেট। ভুক্তভোগীদের কাছে দেবদূত সমতুল্য এই মানুষগুলো ‘সিরিয়ান সিভিল ডিফেন্স’ গোষ্ঠীর সদস্য৷ ২০১২ সালের শেষদিকে প্রতিষ্ঠিত গ্রুপটি এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। আহতদের কোলে নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেরিয়েছে। আর অসহায় মানুষের সেবা করতে গিয়ে তাদের শতাধিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। কাজের সময় তারা সবাই সাদা হেলমেট পরতেন বলে তাদের ‘হোয়াইট হেলমেট ’ নামে সম্বোধন করা হয়।

বেকারিকর্মী, দর্জি, বিক্রেতা, শিক্ষক, কাঠমিস্ত্রী, চিকিৎসক থেকে শুরু করে অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষ হোয়াইট হেলমেটের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। তাদের সদস্য সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। ২০১৬ সালে এই সংগঠনটিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার জন্য বিশ্বের প্রায় ১৩০টি প্রতিষ্ঠান সমর্থন জানায়।

মাথায় হেলমেট পরা হয় নিজের সেফটির জন্য। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য হেলমেট পরা জরুরি। হোয়াইট হেলমেটের সদস্যরাও নিজেদের সেফটির জন্যই হেলমেট পরতেন। যাতে উদ্ধার কাজে অংশ নিতে গিয়ে মাথায় আঘাত না পান। কিন্তু হেলমেটের অপব্যবহার করার নজির বোধহয় এবারই বাংলাদেশের কতিপয় যুবক সৃষ্টি করল।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে আক্রমণ করেছে হেলমেট বাহিনী। পুলিশের দলে ঢুকে তারা হামলা চালিয়েছে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের উপর। তাই তাদের হেলমেট পরার উদ্দেশ্য হয়ত সবাই বুঝতে পেরেছেন। নিজের পরিচয় আড়াল করতেই তারা এমনটি করেছেন। তাদের বুদ্ধির দৌড় এই পর্যন্ত হলেও সমাজে তাদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ নেই এটা ভাবার মতো বুদ্ধিশক্তি হয়ত তাদের ছিল না।

খুদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিবির এবং ছাত্রদলের লোকজন ঢুকে পড়েছে— এমন যুক্তি দেখিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার তাগাদা দেওয়া হয়। একদিকে সরকারের তাগাদা অন্যদিকে হেলমেট বাহিনীর তান্ডব। খুদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শুরু হয় বড়দের ধান্দাবাজি।

রাজধানীর জিগাতলায় হেলমেট বাহিনীর সদস্যদের গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সাংবাদিক পেটাতে দেখা যায়। এক আঘাতেই যাতে মাথাটা ফেটে যায় তেমনই ছিল তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ।

অস্ত্র উচিয়ে ধরে শিক্ষার্থীদের শাসানোরও ভিডিও দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন ভিডিও হয়ত অধিকাংশ মানুষই দেখেছেন।  সর্বশেষ বসুন্ধরায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের উপর আক্রমণ করতে দেখা গেছে এই হেলমেট বাহিনীর সদস্যদের।  তাদেরকে সব সময় পুলিশের দলে ঢুকে পুলিশের পাশাপাশি হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে। কিন্তু সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে তারা আওয়ামীলীগ কিংবা তাদের অঙ্গ সংগঠনের কেউ না। তাহলে কি শিবির ও ছাত্রদলের ছেলেদের সাথে নিয়েছে পুলিশ?  এমন আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস করার যুগ অনেক আগেই শেষ হয়েছে— এটা হয়ত অস্বীকারকারীরা ভুলে গেছেন।

নতুন ছাত্রলীগ সভাপতিও বলেছেন, তাদের দলের ছেলেরা কারো গায়ে ফুলের টোকাও দেয়নি। তার কথা সত্য। সত্যি সত্যি কোনো ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী আন্দোলনকারী কিংবা সাংবাদিকদের গায়ে ফুলের টোকাও দেননি। তবে লাঠি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন। ফুলের টোকা আর মাথা ফাটানো তো এক কথা নয়, আলাদা কথা।

রাজনীতির ফাঁক গলানো কথায় মানুষের মন ভরবে না এই তথ্যপ্রযুক্তির ‍যুগে। সাধারণ মানুষকে মিথ্যা কথায় ক্রমাগত দমিয়ে  রেখে যে বাতাস ভারী করা হচ্ছে সেই বাতাস একদিন ঝর হয়ে দেখা দিতে পারে।

রাজনীতিহীন আন্দোলনে রাজনীতি ঢুকে পড়ায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অশান্তিতে ভরে গেল। খুদে শিক্ষার্থীরা দেখলো বড়দের বুদ্ধি অনেক বেশি। তারাও হয়ত এমন বুদ্ধির চর্চা করবেন একদিন।

হেলমেটীয় রাজনীতির কৌশলে হয়ত অনেকেই সফল হয়েছে। তাদের হয়ত কিছুই হবে না। বরং আগামীতে এই হেলমেটীয় আক্রমন আরো বেশি দেখা যেতে পারে। কে কার দ্বারা আক্রান্ত হবে তা প্রমাণ করাই কঠিন হবে। প্রত্যেকটি গুন্ডার মাথায় থাকবে একটি করে হেলমেট। হেলমেটে হেলমেটে ভরে যাবে চারিদিক। ক্যামেরা ভিউ অনেক সুন্দর দেখা যাবে। কিন্তু তাদেরকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য কেউ কোনোদিন সুপারিশ করবে না। বরং লজ্জিত বোধ করে হোয়াইট হেলমেট সদস্যরাই হয়ত একদিন হেলমেট পরা ছেড়ে দেবেন।

-প্রতারিত সাংবাদিক

বাংলাটুডে/জান্নাত স্বপন

Comments are closed.