rockland bd

দুর্গাপূজার সার্বজনীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতা

0

ডি এম দিলু-


সার্বজনীন উৎসবের প্রকাশ ঘটিয়ে শুরু হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ‘দুর্গা’ নামের একাধিক ব্যাখ্যা আছে। যেমন- ‘দুর্গ’ বা ‘দুর্গম’ নামক এক অসুরকে বধ করেন বলে দেবীর নাম হয় ‘দুর্গা’; মানুষের দুর্গতি দূর করেন বলে তার নাম হয় ‘দুর্গা’।

(দুর্গতিনাশিনী দুর্গা) ইত্যাদি নাম যে কারণেই হোক, ভক্তরা যে তার পূজা করেন দুর্গতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, দুর্বৃত্তদের দমন করার জন্য- এ ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই।

লোকসাহিত্য থেকে জানা যায়, বঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন হয় ১৫ শতকে। দিনাজপুর ও মালদার জমিদাররা এ পূজা চালু করেন। আরেকটি মতবাদ অনুযায়ী, রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ কিংবা নদিয়ার রাজা ভবানন্দ মজুমদার ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশে প্রথম দুর্গাপূজা চালু করেন। তখন দুর্গাপূজা হতো রাজা-জমিদারদের দ্বারা। কারণ এ পূজাটি খুবই ব্যয়বহুল।

১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সমষ্টিগতভাবে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। তা থেকে এর নাম হয় ‘বারোয়ারি’ পূজা, যা বর্তমানে ‘সার্বজনীন দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিত।

দুর্গাপূজা সার্বজনীন হওয়ার ফলে এর বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন ঘটেছে। এর সঙ্গে সাধারণ হিন্দুদের সংশ্লিষ্টতা বেড়েছে। সমাজের ধনী-দরিদ্র সব শ্রেনীর হিন্দুরা একসঙ্গে মিলে এ উৎসব পালন করার সুযোগ লাভ করেছে। এখানে উঁচু-নিচু কিংবা জাতি-সম্প্রদায়গত ভেদ নেই। উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের মধ্যে যে অস্পৃশ্যতার দেয়াল ছিল, তাও অনেকাংশে দূর হয়েছে।

সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিলেত গেলে যাদের জাত যেত, তাদের পূজায় এ সময় বিধর্মী ব্রিটিশদেরও অংশ্রহণের কথা জানা যায় ইতিহাস থেকে। ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা এবং সৈনিকরা পর্যন্ত পূজায় অংশগ্রহণ করতেন, দেবীকে প্রণাম করতেন; এমনকি প্রসাদ পর্যন্ত খেতেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অডিটর জেনারেল জন চিপস তার বীরভূম কার্যালয়ে দুর্গাপূজা চালু করেছিলেন। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশদের এরূপ পূজায় অংশগ্রহণ ছিল। তার পরে অবশ্য সরকারি এক আদেশবলে এটা রহিত করা হয়।

দুর্গাপূজার এই সার্বজনীনতা দেবী প্রতিমার রূপ-কল্পনায়ও পরিলক্ষিত হয়। অন্য সব দেবতাই এককভাবে পূজিত হন; কিন্তু দেবী দুর্গা পূজিত হন সমষ্টিগতভাবে। এখানে তার সঙ্গে থাকেন সিদ্ধিদাতা গণেশ, দেব সেনাপতি কার্তিক, জ্ঞানের দেবী সরস্বতী ও ধনের দেবী লক্ষ্মী। সবাইকে একসঙ্গে পূজা দেওয়া হয়। এই যে সামষ্টিকতা, এটি সমাজের জন্য খুবই প্রয়োজন।

বিচ্ছিন্নতা সব সময় উন্নয়নের পরিপন্থী; সমষ্টিকতা উন্নয়নের চাবিকাঠি। যে মহিষাসুরকে কোনো দেবতাই বধ করতে পারছিলেন না; দেবী দুর্গা সপরিবারে এসে তা করলেন। দুর্গাপূজার এই সার্বজনীনতা, পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় আরও আছে। এ পূজায় সকলশ্রেণির লোকের প্রয়োজন হয়- ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে কামার, কুমোর, মালী, ঢুলি সবাইকে। যে যার কাজ করেন।

বর্তমানে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যে বহুমাত্রিক আয়োজন লক্ষ্য করা যায়, তাতে অর্থনীতির বিষয়টিও চোখ এড়ানোর মতো না। দৃষ্টিনন্দন যে প্যান্ডেলটি নির্মিত হয়, তা রীতিমতো একজন স্থপতির কাজ। তিনি তার শ্রম ও বিদ্যার দ্বারা প্যান্ডেলটি নির্মাণ করে সন্তোষজনক পারিশ্রমিকও লাভ করেন।

কেউ ফুলের মালা তৈরি করে, কেউ সোলার মালা তৈরি করে, কেউ ঢোল বাজিয়ে, কেউবা নেচে-গেয়ে, কেউ কেউ হরেক রকমের জিনিস তৈরি করে এ সময় যা আয় করেন, তা অসন্তোষজনক নয়। এসব কাজে সমাজের নানা স্তরের মানুষের হাত থাকে। তাদের স্পর্শে দেবীর পূজা সম্পূর্ণ হয়, যা কলুষিত হয় না। এমনকি দেবীর পূজায় পতিতার গৃহাঙ্গনের মাটিও লাগে। এটিও অসাম্প্রদায়িকতার একটি চরম নিদর্শন। মায়ের কাছে তার কোনো সন্তানই হীন নয়।

এ প্রসঙ্গে মায়ের পূজা উপলক্ষে যে চরীপাঠ হয়, তার কিছু কথাও সার্বজনীন। চরীতে বলা হয়েছেঃ যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।

অর্থাৎ যে দেবী মায়ের মতো সব জীবের মধ্যে অবস্থান করছেন, তাকে আমি নমস্কার করি। সন্তানের মধ্যে মা (এবং বাবা) কীভাবে অবস্থান করেন, তা সন্তানের মুখ ও স্বভাব দেখলেই বোঝা যায়। এ তো লুকোনোর নয়। বৃক্ষের বৈশিষ্ট্য যেমন ফলে প্রকাশ পায়, তেমনি মায়ের বৈশিষ্ট্যও সন্তানের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এ তো জগতের সব মা ও সন্তানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এখানে তো জাতিভেদের কোনো অবকাশ নেই। সূর্যের আলোর মতো সত্য, যা সবার ক্ষেত্রেই সমান।

বাংলাদেশে এ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্মের দুটি দিক আছে- একটি পালনীয়, অপরটি উপভোগ্য। পালন করেন অনুসারীরা, উপভোগ করেন সকলে। উপভোগের ক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ নেই। আর থাকারও কথা নয়। একই বনে যেমন ভিন্ন ভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ থাকে এবং তাদের নিয়েই বন, তেমনি একই সমাজে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ থাকবে। তাদের নিয়েই সমাজ। সেই সমাজের সবাই মায়ের স্নেহ পাবে, বিদ্যার্জন করবে, শান্তিতে থাকবে, বাকি সবই পাবে- এটাই মূল কথা। দুর্গাপূজার মূল সুরই এটা। পূজাটা উপলক্ষ, ঐক্যটাই আসল। তাই তো এখানে কামার-কুমার সব এক হয়ে যায়।

দেবী দুর্গার জন্মকাহিনীতে ঐক্যের সুর ধ্বনিত। ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর পুরুষের হাতে অমর। তাই সে প্রমত্ত হয়ে স্বর্গ-মর্ত্য কাঁপিয়ে তুলেছে। দেবতারা স্বর্গহারা। নিরুপায় দেবতারা গেলেন বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণু বললেন, ‘সবাই এক হও।’ সবাই এক হলেন। সব দেবতার সম্মিলিত শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হলেন দুর্গা।

তারপর সব দেবতার অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তিনি গেলেন রণক্ষেত্রে। সম্মিলিত সেই শক্তির কাছে মহিষাসুরের পরাজয় হলো। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে সুফল পাওয়া যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এরূপ দৃষ্টান্ত বিশ্বে আরো রয়েছে। অতএব, দুর্গাপূজার মূলে এই যে সার্বজনীনতা, ঐক্য এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা; এ বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পারলে দুর্গাপূজা সার্থক হবে, দেশ ও দশের কাজে লাগবে।

নতুবা এ কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে; তাতে দেশ ও দশের কল্যাণ খুব কমই হবে। সার্বজনীন এ পূজার মাধ্যমে শিক্ষা নেয়া উচিত যে, যে কোন সমস্যা সার্বজনীন ভাবে প্রতিহত করা যতটা সহজ হয়। এককভাবে তা কোনো ভাবেই সম্ভবনা। দুর্গাপূজা সার্বজনীনতা ও অসাম্প্রদায়িকার শিক্ষা দিয়েছে।

বাংলাটুটে২৪/আর এইচ

Comments are closed.