rockland bd

নদী ভাঙন রোধে চাই নতুন ভাবনা

0

ডেস্ক প্রতিবেদন-


নিয়মিত নদী ভাঙনে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন অনেকে৷


আল-মাহমুদ তাঁর ‘চোখ যখন অতীতাশ্রয়ী হয়’ কবিতায় নদী ভাঙনের মনো-সামাজিক ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন এক কিশোরের জবানিতে৷ কবিতার ভাষায়, কিশোরের ‘গ্রাম ছিল এক উদ্দাম নদীর আক্রোশের কাছে ক্রমাগত ভাঙনের রেখা’৷কবিতার শেষ চরণটি মর্মান্তিক৷ ভাঙতে ভাঙতে নদী যেদিন ঘরের কাছে এসে ঠেকেছে, সেদিন তাদের বসতবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে৷ নদীতে ভাঙনের বদলে চর জাগার স্বপ্ন দেখতে দেখতে মারা যাওয়া পিতার কবর ঘরের পাশেই৷ শেষবারের মতো দেখতে গিয়ে চরের মতো ঢেউ খেলানো কবরের পাশে বসে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে শুরু করলেন কিশোরের মা৷ কিশোরের জবানিতে আল-মাহমুদ বলছেন – ‘অভিযোগহীন এমন রোদনধ্বনি কখনো শুনিনি আর’৷ আসলেই তো, নদী ভাঙনের শিকার মানুষ কার কাছে অভিযোগ করবে?

বঙ্গীয় ব-দ্বীপে হাজার বছর ধরেই নদী ভাঙন এক অনিবার্য বাস্তবতা৷ বাংলাদেশের প্রায় সব নদীর চূড়ান্ত উৎস উজানের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল৷ ফলে পার্বত্য অঞ্চলে চাপের মধ্যে থাকা স্রোতস্বিনী পলল সমভূমিতে এসে এমনিতেই আড়মোড়া ভাঙতে চায়৷ স্রোত যখন প্রবল হয়, ভাঙন তখন আরও বাড়ে৷ যে কারণে বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ও শেষে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদ ভাঙনের মুখে পড়ে৷

সেই ‘ক্রমাগত ভাঙনের রেখা’ কত লম্বা? একটি গ্রাম, বাজার, শহর বা জেলা নয়; মোটামুটি ১২শ কিলোমিটার দীর্ঘ, একটি হিসেবে দেখা গেছে৷ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ মতে, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর প্রায় তিনশ ‘ভাঙনপ্রবণ’ স্পষ্ট রয়েছে৷ প্রায় প্রতিবছরই সেখানে কমবেশি ভাঙন দেখা দেয়৷ যেমন চলতি মৌসুমেও ৫২টি জেলার ২৭২টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে৷ সরকার ও সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ যদিও শরীয়তপুরের নড়িয়া এলাকায় পদ্মার ভাঙনের দিকে বেশি নিবদ্ধ, অন্যান্য ভাঙন এলাকাও সেখানকার জন্য সমান উদ্বেগের৷

নদী ভাঙন সাধারণভাবে ‘প্রাকৃতিক’ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ ব-দ্বীপ অঞ্চলের নদ-নদীর ভাঙা-গড়াই নিয়তি৷ আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিতেও এর ছাপ স্পষ্ট৷ কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান রয়েছে – ‘এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে/এই তো নদীর খেলা/এই তো বিধির খেলা/সকাল বেলা আমির রে ভাই/ফকীর সন্ধ্যা বেলা’৷ কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে নদী একই এলাকা বছরের পর বছর ভেঙে চলে, বা চলতে দেওয়া হয়; তার নজির আর কোনো ব-দ্বীপে আছে বলে মনে হয় না৷

পানি উন্নয়ন বোর্ডেরই একটি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত চার দশকে কমবেশি এক লাখ হেক্টর ভূমি নদীগর্ভে চলে গেছে৷ এই ভূমি আসলে কতখানি একটা হিসাব দিলে পরিষ্কার হতে পারে৷ যেমন মেহেরপুর জেলার আয়তন ৭১ হাজার ৬১০ হেক্টর৷ তার মানে, গত চার দশকে বাংলাদেশ একটি আস্ত জেলার চেয়েও বেশি ভূমি নদীতে হারিয়েছে৷ ভাঙনের এই বিপর্যয়কে নিছক ভূমির হিসেবে দেখলে ভুল হবে৷ এক একটি ভাঙন মানে কিছু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়া৷ সকালবেলার অনেক আমির সন্ধ্যাবেলা ফকীর হয়ে যাওয়া৷

প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানোর উপায় নেই৷ বিশেষত বাংলাদেশের মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই টিকে আছে৷ কিন্তু অন্যান্য দুর্যোগের সঙ্গে নদী ভাঙনের পার্থক্য হচ্ছে, ভাঙন কবলিত মানুষ এক ধাক্কায় পায়ের নীচের মাটিটুকুও হারিয়ে ফেলে৷ বন্যায় সব ধুয়ে গেলে, ঘূর্ণিঝড়ে উড়ে গেলেও ভিটেমাটিটুকু থাকে৷ কিন্তু নদীভাঙনে সেটুকুও থাকার যো নেই৷ পরিহাসের বিষয়, এত গুরুতর একটি দুর্যোগ ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সরকারিভাবে দুর্যোগ হিসেবেই স্বীকৃত ছিল না!

স্বীকৃতি না থাকার কারণে নদী ভাঙনের শিকার জনগোষ্ঠী সরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতার বাইরে থাকতো বটে, নদী ভাঙন ‘রোধে’ চেষ্টার কমতি ছিল না৷ আমরা দেখি প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয় ভাঙন রোধে৷ যেমন এই মুহূর্তে আমার সামনে রয়েছে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (২০১৮-২০১৯) প্রায় হাজার পৃষ্ঠার ঢাউস বইটি৷ সেখানে দেখা যাচ্ছে, এই অর্থ বছরে পানি সম্পদ খাতের ৭৬টি প্রকল্পে মোট ৪ হাজার ৫৯২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে৷ এর মধ্যে ৩০টির বেশি হচ্ছে ভাঙন রোধ বা তীর সংরণ সংক্রান্ত প্রকল্প৷

বরাদ্দের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে – ‘বাংলাদেশের নদীগুলির তলদেশ পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদী খনন অপরিহার্য হয়ে পড়ছে৷ একইসঙ্গে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্যে নদীগুলির নাব্যতা রা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভাঙন প্রতিরোধের জন্য নদী খনন গুরুত্বপূর্ণ৷ এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার নদী খননের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে৷’

এক অর্থ বছরেই যদি পানি সম্পদ খাতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ হয়, সেটা সামান্য হতে পারে না৷ স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কত টাকা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার নামে ব্যয় হয়েছে, সেই হিসাব পাওয়া সহজ নয় অবশ্য৷ শুধু চলতি বছরে হিসাব করলে হবে না৷ কিছু প্রকল্প আরও আগে থেকে চলছে৷ দেখা যাচ্ছে, শুধু পানিসম্পদ মন্ত্রণালেয়র আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদী তীর রক্ষা ও খনন কাজে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা৷ নদী গবেষকরা একটি সমীক্ষা করতে পারেন, এ পর্যন্ত শুধু নদী ভাঙন রোধে কত টাকা ব্যয় হয়েছে৷


রাষ্ট্রীয় সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস)-এর তথ্য মতে, প্রতি বছর ভাঙনে নদীতে চলে যায় প্রায় চার হাজার হেক্টর জমি৷ আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লাখখানেক পরিবার৷ সব কিছু হারিয়ে নানা ধরনের দুর্দশার মুখোমুখি হয় তাঁরা৷


সেই অর্থ কতটা কাজে আসে, সেটা আরেকটি প্রশ্ন৷ কারণ ভাঙন রোধে নদীতীরে যেসব প্রকৌশল স্থাপনা তৈরি করা হয়, সেগুলোর গুণগত মান, কৌশল নিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই৷ এ সব কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত বৃহত্তম সংস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাদ্দ অর্থের বেশিরভাই আরিকভাবেই ‘পানিতে ফেলে’ বলে রসিকতা চালু রয়েছে৷ আমরা দেখে আসছি, চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জের মতো জনপদকে ভাঙনের কবল থেকে রার জন্য ইতিমধ্যে আরিক অর্থেই শত শত কোটি টাকা খরচ করলেও আখেরে কোনো লাভ হয়নি৷

কারণ কী? আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশে যে নদী ভাঙন, তা নিছক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয়৷ দীর্ঘ অবহেলা ও পরিকল্পনাহীনতা কিংবা উন্নয়েনর ভ্রান্ত মডেলই আমাদের গ্রাম ও শহরগুলোকে নদীর করাল গ্রাসের কাছে বিপন্ন করে তুলেছে৷ পলল নদীকে বশে রাখতে হলে একদিকে যেমন পাড় বাঁধতে হয়, অন্যদিকে প্রয়োজন হয় প্রবাহ যাতে মাঝনদী বরাবর থাকে, প্রবাহের জন্য যাতে পর্যাপ্ত গভীরতা থাকে; সেই ব্যবস্থা করা৷ দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে নদী শাসনের কাজ বরাবরই ‘একচোখা’৷ পাড় বাঁধার দিকে যতটা মনোযোগ দেওয়া হয়, প্রবাহকে মাঝনদীতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তার সিকিভাগও নয়৷

অন্য সমস্যাও আছে৷ প্রকল্প প্রণয়ন, পাশ, বরাদ্দ, অর্থ ছাড় – প্রভৃতি নানা ধাপ পেরিয়ে যেতে যেতে ভাঙন বসে থাকে না৷ ততদিনে প্রয়োজন হয় আরও বেশি অর্থের৷ এমন প্রতিবেদনও আমার চোখে পড়েছিল, বরাদ্দ অর্থ হাতে পেয়েও কর্তৃপক্ষ ভাঙন রোধে কাজ শুরু করতে পারছে না; কারণ ওই অর্থে কুলাবে না৷ বরাদ্দ আসতে আসতে আরেকটি বর্ষা মৌসুম এসে যাওয়ায় কাজ শুরু করা যায় না, এমন নজিরও কম দেখিনি৷


বাংলাদেশ জুড়ে থাকা কয়েকশ’ নদী-উপনদীতে ভাঙন হলেও সবচেয়ে বেশি ভাঙন-প্রবণ যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা৷ স্বাধীনতার পর থেকে নদী ভাঙনে এ দেশের পৌনে দুই লাখ হেক্টরের মতো জমি বিলীন হয়েছে বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে৷


নদী ভাঙনের মতো প্রকল্পতে ঠিকাদারি চক্র, ঘাটে ঘাটে কমিশন, বখরা – এ সব তো এখন ‘ওপেন সিক্রেট’৷ এর বাইরে কাজ ও উপকরণের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে৷ ঘূর্ণয়মাণ ‘পানির নীচে’ কী ধরনের ‘কাজ’ হয়, কে দেখতে যাবে! বস্তুত নদী ভাঙন রোধে বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহারের বিকল্প নেই৷ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে সীমাবদ্ধ সম্পদ এভাবে ভাঙন ঠেকানোর নামে ক্ষয় হয়ে যাবে, রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর পকেট ভারি হবে; মেনে নেওয়া যায় না৷ আর দীর্ঘমেয়াদে হলেও, নদী ভাঙন রোধের প্রচলিত, গতানুগতিক, শতাব্দীপ্রাচীন, ধারা থেকে বের হয়ে আসতেই হবে৷ বের হয়ে আসার কী সেই পথ?

প্রথমত, কেবল ভাঙন এলাকায় মনোযোগ নিবদ্ধ করে ভাঙন ঠেকানো যাবে না৷ ভাঙন রোধে গোটা নদীকে নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে৷ এ বছর সবচেয়ে আলোচিত নড়িয়ার ভাঙনই উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক৷ দু-তিন বছর আগেও সেখানে এত বড় ভাঙনের আলামত ছিল না৷ অনেকের মনে থাকার কথা ২০১৩ ও ২০১৫ সালে প্রায় একই মাত্রার ভাঙন দেখা দিয়েছিল উজানে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টে৷ পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকার কাছে৷ নানা কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ভাঙন ঠেকানো গেছে৷ পদ্মার বাম তীরের ওই ভাঙন যখন ঠেকেছে, এর ভাটিতে ডান তীরে অবস্থিত নড়িয়ায় তখন ভাঙন দেখা দিয়েছে৷ একই ধরনের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে ব্রহ্মপুত্র বা যমুনার ভাঙনের ক্ষেত্রে৷ কয়েক দশক ধরে ডান তীরে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা ভাঙছিল৷ সেখানে যখন ভাঙন খানিকটা ঠেকানো গেছে, এখন ধাক্কা লাগছে বামতীরের রৌমারী উপজেলায়৷ আমার আশঙ্কা, আগামী দু-এক বছরে নড়িয়ায় ভাঙন ঠেকানো গেলেও আরও ভাটিতে বাম বা ডান তীরে পরের বছর ভাঙন দেখা দিতে পারে৷ তার মানে কেবল ভাঙনের স্পট নয়, গোটা নদী নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে৷


নদী ভাঙনে মানুষের ভিটে-মাটির সঙ্গে এলাকার স্কুল-কলেজ, হাপাতালসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও হারিয়ে গেছে৷ নড়িয়ার আড়াই লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছিল ২০১৪ সালে৷ সাম্প্রতিক সময়ে সেই হাসপাতালও গিলতে শুরু করেছে পদ্মা৷ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনের বেশিরভাগ অংশ ইতোমধ্যে চলে গেছে নদীতে৷


দ্বিতীয়ত, গোটা নদী নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা যদি কেবল তীর বাধাইয়ের হয়, তাহলেও তা কতখানি কার্যকর হবে বলা মুশকিল৷ এটা এখন প্রায় প্রমাণিত যে, কেবল পাড় বেঁধে বা তথাকথিত তীর সংরণের মাধ্যমে নদী ভাঙন রোধ করা যে কঠিন৷ আমরা দেখছি, দেশের নদ-নদীগুলোর গভীরতা ক্রমাগত কমছে৷ কারণ উজানে বিভিন্ন স্থাপনার কারণে প্রবাহের গতি যখন শ্লথ হয়, তখন সিল্ট বা তলানিপ্রবাহ সাগরে যাওয়ার আগে মাঝপথেই আটকে যায়৷ ঘন ঘন চর পড়ে, গভীরতা কমতে থাকে৷ এখন তলদেশ যদি উন্নত হতে থাকে, পাড়ে যত বাঁধই দেওয়া হোক না কেন, ওই নদীর পানি জনপদের দিকে ছুটবেই৷

কেউ ভুল বুঝবেন না যে, নদী প্রবাহের তীরমুখী প্রবণতা বন্ধ করতে গিয়ে আমি বহুল-প্রার্থিত ড্রেজিংয়ের কথা বলছি৷ ড্রেজিং সমর্থনযোগ্য নয় এই কারণে যে, পলল নদীগুলোতে ড্রেজিং কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে না৷ এক বছর ড্রেজিং করে গেলে পরের বছরই তা ভরাট হয়ে যাওয়ার নজির দেশে অনেক রয়েছে৷ পাথুরে মাটিতে এই ব্যবস্থা চলতে পারে, বঙ্গীয় ব-দ্বীপের পলল ভূমিতে কদাচ নয়৷ এছাড়া ড্রেজিং স্পষ্টতই প্রতিবেশবৈরী৷ এর মধ্য দিয়ে মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের আবাস ও প্রজনন বিনষ্ট হয়৷ আর ড্রেজিংয়ের উপকরণ সংগ্রহ, পরিচালনার মধ্যে অনিয়ম ও দূর্নীতির সুযোগ অবারিত৷


নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রাথমিক সহায়তায় এগিয়ে আসে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা৷ পরে এক সময় এসব মানুষকে নিজের পথ বেছে নিতে হয়৷ নড়িয়ায় সব হারানো পরিবারগুলোকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে ৩৯টি সাইক্লোন সেন্টারে৷ খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল ও শুকনা খাবার পাচ্ছেন তাঁরা৷


নদীর নাব্যতা রায় ড্রেজিংয়ের বিকল্পই আসলে আমার তৃতীয় যুক্তি৷ তা হচ্ছে, বিপুল ব্যায়বহুল ‘কংক্রিটাইজড’ ও জ্বালানিনির্ভর নদী ব্যবস্থাপনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে৷ এক্ষেত্রে একটি কথা আমি প্রায়শই বলে থাকি৷ ড্রেজিং আবিষ্কার হয়েছে উনিশ শতকের গোড়ায়৷ তার আগে আমাদের দেশে কি নদী ব্যবস্থাপনা ছিল না? আমাদের পূর্বপুরুষরা হাজার বছর ধরে এই গঙ্গা-যমুনা অববাহিকায় বসবাস করেছে৷ তারা কীভাবে নদীর নাব্যতা বজায় রাখতো? তারা কীভাবে ভাঙন মোকাবেলা করতো? এই দেশের জন্য অনুপযোগী পশ্চিমা প্রকৌশল রপ্ত করতে গিয়ে আমরা লোকায়ত সেসব প্রযুক্তি বহুলাংশে হারিয়ে ফেলেছি৷


বাংলাদেশের ভাঙন-প্রবণ অধিকাংশ নদীর পাড়ই বাঁধাই করা নয়৷ বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লে ভাঙন শুরু হলে তা ঠেকাতে তৎপর হন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা৷ ব্লক, বালুর বস্তা ফেলে শহর এলাকা রক্ষার চেষ্টা করেন তাঁরা৷


এর একটি হচ্ছে ‘বান্ধাল’৷ ইংরেজিতে বলে ‘ব্যান্ডেলিং’৷ এই প্রযুক্তিতে বাঁশ ও ধইঞ্চার মতো স্থানীয়, পরিবেশসম্মত, স্বল্পমূল্যের উপকরণ ছাড়া আর কিছু লাগে না বললেই চলে৷ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় এখনো এটা টিকে রয়েছে৷ মোটামুটি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় এক একটি বান্ধাল তৈরি করা যায়৷ এক কিলোমিটার পরপর বসানো গেলে একটু সময় লাগে বটে, নদীর স্রোত ঘুরে যায়৷ এখনো কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী যমুনার মতো প্রবল নদী বশে আনতে এই প্রযুক্তি সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করে চলছে৷ আশার কথা, সরকারিভাবেও কোথাও কোথাও লোকায়ত জ্ঞানভিত্তিক এই প্রকল্পের ‘পাইলটিং’ হচ্ছে৷ কিন্তু বৃহৎ পরিসরে, নদী ব্যবস্থাপনার জাতীয় নীতি ও কৌশল আকারে আমাদের রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদার চক্র, সরকারি-বেসরকারি প্রকৌশলীরা ‘কমদামি’ এই নদী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির গ্রহণে কেন আগ্রহী নয়, তা অনুমান করা কঠিন হতে পারে না৷ । সূত্র: ডয়েচে ভেলে

বাংলাটুডে২৪/এবিএস

Comments are closed.