rockland bd

মাসুমা আলীজাদা: অলিম্পিকে আফগান নারীদের অনুপ্রেরণা

0

টোকিও অলিম্পিকে শরণার্থী কোটায় নামবেন আফগান নারী সাইক্লিস্ট মাসুমা আলীজাদা। (সৌজন্য ছবি: দ্য গার্ডিয়ান)

 

বাংলা টুডে ডেস্ক

যখন মাসুমা আলীজাদা তার সাইকেলটি নিয়ে ফুজি পর্বতমালার পাদদেশে অলিম্পিকের ইভেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য দাঁড়াবেন, তার দেশের একদল নারীর মন ভরে যাবে টিভির পর্দায় তাকে দেখে। যেন মাসুমা নন, তাদের প্রত্যেকে মাসুমার শরীরে নিজেকেই দেখবেন। অলিম্পিকে সবাই যায় মেডেল জয়ের জন্য, মাসুমার সঙ্গে তারা কল্পনায় যাবেন মাথা তুলে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার জন্য। প্রত্যেকে মন থেকে বলবেন, ‘আমি আফগান নারী, সুযোগ দিয়ে দেখো, আমিও পারি।’

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অন্তঃপুরে বন্দি হয়ে আছে আফগান নারীরা। বরাবরই মুক্তভাবে চলাফেরা করার স্বাধীনতা ছিল তাদের প্রত্যাশা। তবে পর্দা প্রথার অজুহাতে আফগানিস্তানের সব গোষ্ঠীর পুরুষরা শত শত বছর ধরে তাদের শাসন করছে এবং ইচ্ছাগুলোকে দমন করেই রেখেছে। গত পঞ্চাশ বছরে প্রথমে সোভিয়েত শাসন ও পরে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন যৌথবাহিনীর শাসনামলে নানা সংকটের মধ্যেও কিছু নারী ঘরের বাইরে পা ফেলার সাহস করেছিলেন। তাদেরই একজন মাসুমা আলীজাদা। সাইকেল চালানোর দুর্নিবার ইচ্ছা তাকে শত বাধা সত্ত্বেও দমাতে পারেনি, এ কারণে পরিবারসহ দেশ ছাড়তেই বাধ্য হয়েছেন। আফগানিস্তান ছেড়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে ফ্রান্সে। টোকিও অলিম্পিকে শরণার্থী ক্রীড়াবিদ হিসেবে তিনি অংশ নিচ্ছেন সাইক্লিস্ট হিসেবে।

জাপানের ফুজি পর্বতমালার ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে অলিম্পিক ইভেন্ট হিসেবে যখন তিনি সাইক্লিংয়ে নামবেন, তখন রাজধানী কাবুলে তার সাফল্য কামনায় চিৎকার করবেন একদল দুঃসাহসী নারী সাইক্লিস্ট। আর পুরো আফগানিস্তানে অন্তঃপুরে থাকা নারীদের মধ্যে যারা কঠোর পর্দা ছেড়ে বাইরে আসার স্বপ্ন দেখেন তারা বসবেন প্রার্থনায়। মাসুমার জয় তাদের আরাধ্য, না জিতলেও অলিম্পিকের মঞ্চে একজন নারী হিসেবে দেশের নাম তুলে ধরা মেয়েটাকে মন ভরে দোয়া করবেন সবাই, যদিও ধর্মীয় রক্ষণশীল তালেবানদের চোখে মাসুমা যে অপরাধী হতে  যাচ্ছেন তা না বললেও চলে।

সম্প্রতি আফগানিস্তান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন যৌথবাহিনী। বেশিরভাগ বিদেশি সৈন্য এরইমধ্যে দেশটি ছেড়ে চলে গেছে। এটা এক অর্থে সাময়িক বিজয়। তবে কাবুলে যে আফগান সরকার এখন আছে তারা তালেবানদের বিপক্ষে কতটুকু টিকবে আর লড়াই করতে পারবে তা নিয়ে সবমহলেরই রয়েছে সন্দেহ। তালেবানরা এরইমধ্যে বিভিন্ন শহরের দখল নিয়ে নিয়েছে। অনেক এলাকায় তাদের প্রভাব বাড়ছেই। এ অবস্থায় দেশটির সামগ্রিক পরিস্থিতিই আবার নাজুক হয়ে পড়েছে, বিদেশিমুক্ত দেশে দেশি কট্টরপন্থীদের শৃঙ্খলে আবার আবদ্ধ হচ্ছে আফগান জাতি, বিশেষত মেয়েরা। কারণ, নারী স্বাধীনতার কথা তালেবান ও তাদের আরেক সঙ্গী জঙ্গি সংগঠন আইএস তো শুনতেও পারে না।

এমন পরিস্থিতিতে আফগান সাইক্লিং ফেডারেশনের মহিলা বিভাগের সহকারী উন্নয়ন পরিচালক জাহলা সারমাত তাদের কর্মসূচি আর এগিয়ে নিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে ভীষণ শঙ্কিত। তারপরও মাসুমার সাইক্লিস্ট হিসেবে অলিম্পিকের মঞ্চে লড়াই করার মানসিকতা উদ্বুদ্ধ করছে তাকেও। তিনি বলেছেন, “ওর জন্য আমি এবং দলের সব সদস্য সত্যিই খুব গর্বিত। ওর সাইকেল দৌড় দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আমরা। আশা করছি ও খুব ভালো করবে। সে সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে।”

জাহলা সারমাতও বয়সে মাসুমা আলীজাদার কাছাকাছি। ২১ বছর বয়সী এই ক্রীড়াবিদ দেশে ও দেশের বাইরে অনেক প্রতিযোগিতায় মাসুমার সঙ্গে সাইক্লিং করেছেন। দ্য গার্ডিয়ানকে সারমাত বলেন, ‘মাসুমা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটার প্রতিনিধিত্ব করছে সেটা হলো আফগানিস্তানে নারীর ক্ষমতায়ন। শুধুমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে ওকে অসংখ্য বাধা-বিপত্তির মুখ পড়তে দেখেছি আমি। ও যে এত দূর আসতে পেরেছে, সেজন্য আমি গর্বিত।’

মার্কিন গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, আফগান সরকারের মেয়াদ হয়তো খুব বেশি হলে ছয় মাস। তালেবানরা যেভাবে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে তাতে এই সরকারের খুব শিগগির পতন ঘটবে। আর তালেবানরা ক্ষমতায় এলে সবচেয়ে বেশি দমন-পীড়নের শিকার হবে নারীরা। নারীদের তারা এখনও মনে করে কেবলই ভোগের বস্তু। ক্ষমতায় আসার আগেই ইতোমধ্যে দেশটির কিছু অঞ্চলে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী অবিবাহিত নারী ও বিধবাদের তালিকা চেয়েছে তালেবানরা। এই নারীদের তালেবান যোদ্ধাদের বিয়ে করতে হবে। অতীত বলে, স্বেচ্ছায় পছন্দ বলে কিছু নেই। তালেবান যোদ্ধারা ওই তালিকার যে নারীকে পছন্দ করবে সে হবে তার। মূল কাজ হবে সন্তান জন্ম দেওয়া আর মারধরের মুখে সংসার সামলানো।  আফগান নারীদের তাই প্রতি মুহূর্ত কাটছে নিঃসীম আতঙ্কে। এ অবস্থায় আফগানিস্তানের নারী সাইক্লিস্টদের আর রাস্তায় নামা সম্ভব হবে কিনা তা এখন চরম অনিশ্চয়তায়।

নারী দলের অধিনায়ক, ২৪ বছর বয়সী রুখসার হাবিবজাই দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন,‘আমি নিশ্চিত, তালেবান আর ওদের মতো অন্যরা  (আইএস) কখনও মেয়েদের পড়াশোনা, কাজ বা চাকরি করতে দেবে না। সেখানে আমাদের সাইকেল চালাতে দেবে—তা কী করে সম্ভব? আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত, ওরা আমাদের কখনোই সাইকেল চালাতে দেবে না। ওরা আমাদের স্রেফ গুলি করে মেরে ফেলবে।’

এমনকি এখন যে মেয়েরা সাইকেল চালাচ্ছে তাদের ওপরে যৌথবাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও আফগানরা কখনোই ভালো মনোভাব দেখায়নি। রাস্তায় তাদের সাইকেল চালাতে দেখলে আলু, আপেল, সবজি, ডিম, পাথর-যখন যা হাতের কাছে পেতো তাই ছুড়ে মেরেছে আফগানরা। গালি দিয়েছে যথেচ্ছ, কুৎসা রটনা করেছে অনর্গল। খুব ভোরে, কিংবা রাতে সাইকেল চালিয়েও নিষ্কৃতি মেলেনি। এমন অত্যাচারের মুখেই দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নিয়েছেন মাসুমা আলীজাদা। অলিম্পিকে তিনি সাফল্য পেলে দেশটির মেয়েদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া কিংবা সাইকেল নিয়ে বের হওয়ার ব্যাপারে রক্ষণশীল দেশবাসীর মনোভাব কিছুটা বদলাতেও পারে, এমন আশায় আছেন বাকি সাইক্লিস্টরা।

আফগানিস্তানের ইতিহাস বলে, দেশটিতে দীর্ঘ সময় শাসন চালালেও কোনো বিদেশি শক্তি কখনোই সুবিধা করতে পারেনি। নাইন-ইলেভেনে টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা তালেবান শক্তি ধ্বংসের জন্য আফগানিস্তানে হামলা ও দখল নিলেও দীর্ঘ দুই দশকে কখনোই স্বস্তিতে ছিল না। শেষ অবধি, ধ্বংসলীলায় ছারখার হওয়া দেশটি ছাড়তে বাধ্য হলো তারা। তবে তাদের উপস্থিতিতে নারী উন্নয়নে কিছু সক্রিয় ঘটনা ঘটেছিল দেশটিতে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে, নারীদের সাইকেল চালানো। সাইকেল লুকিয়ে চালানো যায় না, রাস্তায় নামতে হয়। সেজন্য এসেছে পদে পদে বাধা।  তবে সব ধরনের বাধা, পরিবারের আপত্তি এবং অপরিচিতদের হয়রানি সত্ত্বেও আফগানিস্তানে নারীদের মধ্যে সাইক্লিংয়ের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এক দশকের মধ্যে দেশটির সাইক্লিং ফেডারেশনের নারী সদস্যের সংখ্যা বেড়ে ২২০-এ দাঁড়িয়েছে। এমনকি সাতটি প্রাদেশিক নারী দলও হয়েছে। প্রতি গ্রীষ্মে কাবুলে নারীদের বার্ষিক সাইক্লিং প্রতিযোগিতাও হয়।

হাবিবজাই বলেন, স্রেফ জাতীয় দলের অংশ হওয়ার জন্য নারীরা সাইক্লিং করেন না। মেয়েরা সাইক্লিং করেন এ কাজে তারা আনন্দ পান বলে। এদের সবাই এখন তাকিয়ে মাসুমা আলীজাদার দিকে। পরে যা ঘটবে সামলানো যাক আর নাই যাক, এখন কি তিনি তাদের অন্তত সামান্য স্বস্তি এনে দিতে পারবেন? সাইক্লিং যে তাদের কাছে ভালোবাসার অপর নাম।

(দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে)

Comments are closed.