rockland bd

বাগেরহাটে পানিতে ভেসে গেছে সবজি চাষিদের স্বপ্ন

0

ঢাকা, বাংলাটুডে টুয়েন্টিফোর: বাগেরহাটে অতিবৃষ্টি ও অস্বাভাবিক জোয়ারের থাবা পড়েছে সবজি চাষে। খেতে বেশ কিছু দিন ধরে পানি জমে থাকায় মাঠে মারা গেছে চাষিদের স্বপ্ন। শত শত বিঘা জমির সবজি পচে নষ্ট হয়ে শুকিয়ে গেছে। শুধু মাঠই নয়, মৎস্য ঘেরের উঁচু পাড়ের সবজি খেতের চিত্রও একই রকম।
চিতলমারী উপজেলার দুর্গাপুর, খাসেরহাট ও চরলাটিমাসহ বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, মৎস্য ঘেরের দুই পাড়ে থাকা সবজি গাছ মরে ঝুলছে। কোনো কোনো সবজির পাতা শুকিয়ে হলুদ রঙের হয়ে যাচ্ছে। আর মাঠের যতদূরে দৃষ্টি যায় সবখানেই সবজি গাছ মরে শুকিয়ে যাওয়াই চোখে পড়ে। চাষিদের কেউ কেউ মরা সবজি গাছ টেনে ফেলে দিচ্ছেন। কয়েক দিন আগেও মাঠে মাঠে সবুজের সমরোহ ছিল। এখন যা শুকিয়ে বিবর্ণ।
একই সাথে পানের বরোজ এবং পাকা আউশ ধান, রোপান আমন এবং বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাভ তো দূরের কথা, চাষিরা কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। এ অবস্থায় থেকে রক্ষার জন্য সরকারের কাছে সহায়তার দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, অতিবৃষ্টি ও অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে বাগেরহাটে ৭৭৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৬১২ হেক্টর সবজি, পাঁচ হেক্টর সবজির বীজতলা, রোপা আমন ১০০ হেক্টর, আমনের বীজতলা ২৫ হেক্টর, আউশ ধান চার হেক্টর, পান ১৯ হেক্টর এবং ১৩ হেক্টর জমির মরিচ খেত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৫ হাজার ৩৬৮টি কৃষক পরিবার।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে শুধুমাত্র চিতলমারী উপজেলায় পানিতে ১৩ কোটি ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আর গোটা জেলায় কৃষি বিভাগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৭ কোটি ১৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা। তবে চাষিদের তথ্য মতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
জেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ এক লাখ ৩৮ হাজার হেক্টর। আর কৃষক পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৪৪ হাজার ৯৭টি।
সময়ের সাথে সাথে বাগেরহাটে এখন সবজি চাষ অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে চিতলমারীতে তুলনামূলকভাবে সবজির চাষ বেশি। চাহিদা বেশি থাকায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় সারা বছরজুড়েই নানা ধরনের সবজি চাষ হয়। বিশেষ করে মৎস্য ঘেরের পাড়ে সবজি চাষে চাষিদের আগ্রহ বেশি। লাভজনক হওয়ায় মৎস্য ঘেরের পাড়ে নানা ধরনের সবজি ফলান চাষিরা। এখন শীতকালের সবজিও মিলছে গ্রীষ্মকালে।
ব্যাণিজ্যিকভাবে চাষ করা বাগেরহাটের লাউ, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, করলা, শসা, বরবটি, কুশি, চিচিঙ্গাসহ নানা ধরনের সবজির রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এবার পানিতে তলিয়ে সবজি চাষিদের স্বপ্ন মাটিতে মিশে গেছে।
দেড় লাখ টাকা ঋণ করে চার বিঘা জমির মৎস্য ঘেরের পাড়ে শসা, করলা এবং বরবটিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছিলেন দুর্গাপুর গ্রামের আলতাফ হোসেন। তিনি জানান, সবজির ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্ত গত কয়েক দিন ধরে গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকায় এখন মরতে শুরু করেছে। অধিকাংশ সবজি গাছ এরই মধ্যে মরে গেছে।
কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন সেই চিন্তায় দিন কাটছে ষাটোর্ধ্ব এ চাষির।
সুজন মন্ডল নামে আরেক সবজি চাষি জানান, পানিতে তার সাত বিঘা জমির সবজি গাছ মরে গেছে। এখন মরা গাছ টেনে নামানো হচ্ছে। সারা বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেন তিনি। আর এ সবজি বিক্রি করেই সংসার চলে তার। পানিতে সব সবজি গাছ মরে যাওয়ায় পরিবারের খরচ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন তিনি।
চাষি স্বপ্ন নারী মন্ডল জানান, এ বছর পাঁচ বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেছেন। আশা ছিল সবজি বিক্রি করে সংসারের খরচ এবং ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা চলবে। নতুন ঘর তৈরি করারও স্বপ্ন ছিল তার। পানিতে সবজি পচে গিয়ে তার সে স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
চরলাটিমা গ্রামের মহাদেব মন্ডল, বিজন হীরা, বিকাশ মন্ডলসহ আরও বেশ কয়েকজন চাষির সাথে কথা হলে তারা জানান, এ বছর তারা প্রত্যেকেই দুই থেকে তিন লাখ টাকা ধার-দেনা করে বিভিন্ন সবজি এবং পানের বরাজ করেছেন। পানিতে তাদের সবজি ও বরাজ মরে গেছে। সংসার চালাতে এখন সরকারের সহযোগিতা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না তারা।
চিতলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঋতুরাজ সরকার বলেন, ‘গাছের গোড়ায় কয়েক দিন ধরে পানি জমে থাকায় সবজি গাছ মরে যাচ্ছে। চিতলমারীর বিভিন্ন এলাকায় সবজি গাছ মরে যাওয়ার চিত্র প্রায় একই রকম। উপজেলায় ১৩ কোটি ৩৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রঘুনাথ কর জানান, চাষিদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগাম রবি ফসল এবং পলিব্যাগে চারা তৈরি করে রোপনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কোনো জমি পতিত অবস্থায় রাখা যাবে না। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের প্রণোদনা দেয়ার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খবর ইউএনবির।

Comments are closed.