rockland bd

জুমআ দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

0

ধর্ম ও জীবন, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ (বাংলাটুডে) : আজ শুক্রবার। সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। ইসলামে এ দিনটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক।
মহান রাব্বুল আলামীন মুসলমানদের জন্য তিনটি ঈদ নির্ধারণ করেছেন , দুটি আসে বছর ঘুরে, একটি আসে বারে বারে । ইসলামী শরীয়ত প্রতি জুমআকে মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, জুমআর দিন ঈদের দিন (আহমদ)
যেভাবে এলো জুমাবার
প্রথম হিজরি সন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা ছেড়ে মদিনা গেলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মদিনায় পৌঁছার দিনটি ছিল ইয়াওমুল আরুবা (শুক্রবার)। সেদিন তিনি বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায় গেলে জোহর নামাজের সময় হয়। সেখানে তিনি জোহর নামাজের পরিবর্তে জুমআর নামাজ আদায় করেন। এটাই ইতিহাসের প্রথম জুমআর নামাজ।
তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মদিনায় যাওয়ার পর একবার মদিনার আনসার সাহাবিরা আলোচনায় বসেন। তারা বললেন, ইহুদিদের জন্য সপ্তাহে একটি দিন নির্দিষ্ট রয়েছে, যে দিনে তারা সবাই একত্রিত হয়। নাসারারাও সপ্তাহে একদিন একত্রিত হয়। সুতরাং আমাদের জন্য সপ্তাহে একটি দিন নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন, যে দিনে আমরা সবাই সমবেত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করব, নামাজ আদায় করব। অতঃপর তারা আলোচনায় বললেন, শনিবার ইহুদিদের আর রোববার নাসারাদের জন্য নির্ধারিত। অবশেষে তারা ইয়াওমুল জুমআ শুক্রবারকে গ্রহণ করলেন (সীরাতুল মুস্তাফা ও দারসে তিরমিজি)।
পবিত্র কোরআনের নির্দেশ, জুমআর আযান হলেই বেচাকেনা বন্ধ করে দাও, আল্লাহর স্মরণে চলো। হাদীসে বর্ণীত হয়েছে “রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমআর দিন সর্বোত্তম। এই দিন আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিন তাকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, জুমআর দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (মুসলিম, তিরমিজি, নাসাঈ, আবু দাউদ)
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে জুমআ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ! জুমআর দিন যখন নামাযের জন্য আযান দেওয়া হয় , তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ করে দাও। এ তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বোঝ। (সূরা জুমআ : ৯ )
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি) হতে বর্ণীত, জুমআর দিনে ফেরেশতাগণ বিশেষ রেজিস্টার নিয়ে মসজিদের প্রতিটি দরজায় দাঁড়িয়ে যান। তাঁরা মসজিদে আগমনকারী মুসল্লিদের নাম পর্যায়ক্রমে লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। অতঃপর যখন ইমাম সাহেব এসে যান, তখন তারা রেজিস্টার বন্ধ করে খুতবা শুনতে থাকেন। যে সবার আগে মসজিদে প্রবেশ করে, সে একটি উট আল্লাহর রাস্তয় দান করার সওয়াব লাভ করে। যে দুই নম্বরে প্রবেশ করে, সে একটি গরু আল্লাহর রাস্তায় দান করার সওয়াব পায়। যে তিন নম্বরে প্রবেশ করে, সে একটি দুম্বা দান করার সওয়াব পায়। যে চার নম্বরে প্রবেশ করে, সে একটি মুরগি দান করার সওয়াব লাভ করে। আর যে পাঁচ নম্বরে প্রবেশ করে, সে একটি ডিম আল্লাহর রাস্তায় দান করার সওয়াব পায়।
(মুসনাদে শাফী : ৬২, জামে লি ইবনে ওহাব : ২২৯, মুসনাদে হুমাইদি : ৯৬৩ )
যারা জুমআতে উপস্থিত হয় না তাদের ব্যপারে রাসূল কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এ মর্মে হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি সাল্লাম যে সমস্ত লোক জুমআর নামাজ থেকে দূরে থাকে (পড়ে না) তাদের সম্পর্কে বলেছেন, নিশ্চয়ই আমার ইচ্ছা হয় যে আমি কাউকে নামাজ পড়ানোর আদেশ করি, সে মানুষকে নামাজ পড়াক। অতঃপর যে সমস্ত লোক জুমার নামাজ পড়ে না, আমি তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিই।
(মুসলিম : ৬৫২, মুসনাদে আহমাদ : ৩৮১৬, মুসনাদে ইবনে আবি শাইবা : ৫৫৩৯, আসু-সুনানুল কুবরা : ৪৯৩৫)
জুমা দিবসে করণীয়: সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে জামাতের সহিত ফজরের নামাজ আদায় করে জুমার আগে সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করা। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে মহান আল্লাহ পাক তার জন্য জুমার মাঝের সময়টা নূর দ্বারা ভরিয়ে দেয়।’ (বায়হাকী শরীফ)
হজরত সালমান (রা.) হতে একটি হাদিস বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সুন্দর করে গোসল করবে, অতঃপর তেল ব্যবহার করবে এবং সুগন্ধি নেবে, তার পর মসজিদে গমন করবে, দুই মুসল্লির মাঝে জোর করে জায়গা নেবে না, সে নামাজ আদায় করবে এবং ইমাম যখন খুতবা দেবেন, চুপ করে মনোযোগসহকারে তাঁর খুতবা শুনবে। দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
(মুসনাদে আবু দাউদ : ৪৭৯)
জরত ইবনু আওস আস সাক্বাফি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি জুমআর দিন গোসল করবে এবং (স্ত্রীকেও) গোসল করাবে, ভোরে ঘুম থেকে উঠবে এবং অন্যকে ঘুম থেকে উঠাবে; জুমআর জন্য বাহনে চড়ে নয়, বরং পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে এবং কোনোরূপ অনর্থক কথা না বলে ইমামের নিকটে বসে খুতবা শুনবে; তার (মসজিদে যাওয়ার) প্রতি পদক্ষেপ সুন্নাত হিসেবে গণ্য হবে। আর প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময় সে এক বছর যাবত সিয়াম পালন ও রাতভর নামাজ আদায়ের (সমান) প্রতিদান পাবে।
(আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, তিরমিজি)
জুমার দিনে হাতের নখ কাটা, উত্তম রূপে গোসল করা, পরিষ্কার জামা-কাপড় পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, আগে আগে মসজিদের যাওয়ার চেষ্টা করা, ধুমপান না করা, সুন্দর ভাবে দাঁত মেসওয়াক বা ব্রাশ করা। মসজিদে প্রবেশ করে দুরাকাত তাহইয়াতুল মসজিদের নামাজ আদায় করা, ইমাম সাহেবের খুৎবা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা উত্তম।
জুমআর দিনে আল্লাহর পক্ষ হতে বান্দার জন্য একটি বিশেষ হাদিয়া হল , এই দিনে এমন একটা সময় আছে, যখন মুমিন বান্দা কোনো দোয়া করলে মহান আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জুমআর দিনে একটা এমন সময় আছে, যে সময়ে কোনো মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে ভালো কোনো কিছু প্রার্থনা করলে, অবশ্যই আল্লাহ তাঁকে তা দান করবেন।
(সহীহ মুসলিম : ৮৫২, মুসনাদে আহমাদ : ৭১৫১, আস্-সুনানুল কুবরা : ১০২৩৪)
জুমার দিন বেশি বেশি দোয়া পড়া উত্তম। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘জুমার দিন এমন একটা মুহুর্ত আছে যখন কোনো মুসলমান আল্লাহর নিকট কিছু চায় তখন আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করেন’(বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। অন্যদিনের তুলনায় জুমার দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ শরীফ পাঠ করুন। বিশেষ করে দোয়া ও দরুদ শরীফ আসরের পরবর্তী সময়টাতে কবুলের নিশ্চয়তা বেশী থাকে।
দরুদে ইব্রাহিমের আরবি, অর্থ, উচ্চারণ-
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লেআ’লা মোহাম্মদাও ও আ’লা আলি মোহাম্মদ, কামা সাল্লাইতা আ’লা ইব্রাহিমা ও আ’লা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আ’লা মোহাম্মাদেওঁ ও আ’লা আলি মোহাম্মদ, কামা বারকতা আ’লা ইব্রাহিমা ও আ’লা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ।’
অর্থ:‘হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর বংশধরদের ওপর এই রূপ রহমত নাজিল করো, যেমনটি করেছিলে ইব্রাহিম ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করো, যেমন বরকত নাজিল করেছিলে ইব্রাহিম ও তার বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসনীয় ও সম্মানীয়।’
প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি খুৎবার সময় অবহেলা করে সময় নষ্ট করে তার নামাজ নষ্ট হয়ে যায়’। (মুসলিম শরীফ) ইমাম সাহেবের সঙ্গে দুই রাকাত জুমার ফরজ নামাজ আদায় করার পর প্রতিবেশীদের খোঁজ-খবর নেয়া, গরীব দু:খীদের সুখ-দুখের খবর নেয়া এবং কথাবার্তা বলা উত্তম। এই দিনে বিশেষ বিশেষ কিছু আমল রয়েছে, যা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
১. জুম্মার দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন আসর নামাজের পর না উঠে ওই স্থানে বসা অবস্থায় ৮০ বার ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলা আলিহী ওয়াসাল্লিম তাসলীমা’ এই দুরুদ শরিফটি পাঠ করবে, তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ হবে এবং ৮০ বছরের নফল ইবাদতের সওয়াব তার আমল নামায় লেখা হবে। (সুবনহান আল্লাহ)
২. জুম্মার দিনে সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করলে কিয়ামতের দিন আকাশতুল্য একটি নূর প্রকাশ পাবে।
৩. এই দিনে বেশি বেশি দুরুদ শরিফ পাঠ করা এবং বেশি বেশি জিকির করা মোস্তাহাব। এমনিতেই যে কোনো সময়ে একবার দরুদ শরিফ পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা পাঠকারীকে দশটা রহমত দান করেন এবং ফেরেশতারা তার জন্য দশবার রহমতের দোয়া করেন।
৪. জুমার নামাজের পূর্বে দুই খুতবার মাঝখানে হাত না উঠিয়ে মনে মনে দোয়া করা।
৫. সূর্য ডোবার কিছুক্ষণ আগ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জিকির, তাসবীহ ও দোয়ায় লিপ্ত থাকা।
মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করি, আমরা যেন যথাযথ ভাবে পবিত্র জুমা দিবসের গুরুত্ব উপলদ্ধি করে এ দিনের আদব ও আমলগুলো সঠিক ভাবে করতে পারি।
আল্লাহুম্মা আমিন।

-মাওলানা ফজলুল করিম, আরবী ভাষা শিক্ষক
দারুস সুন্নাহ ওয়াল ফিকর

এবিএস

 

Comments are closed.