rockland bd

আসামের নাগরিক পঞ্জীঃ আমরা শঙ্কিত

0

 

                                                                   । । মোহাম্মদ আলী সরকার। ।
যেমনটা আশঙ্কা করা হচ্ছিল অনেকটা তাই সত্য হলো। উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্য আসামে গত ৩১ শে আগষ্ট শনিবার প্রকাশ করা হলো নাগরিক তালিকা। আর সাথে সাথে অবৈধ বিদেশী হিসাবে ঘোষিত হলেন ঊনিশ লাখেরও বেশি মানুষ – এদের সিংহভাগ বাংলাভাষী মুসলমান বলে আমরা প্রাথমিক খবরে জানতে পারছি। এখন এরা যাবেন কোথায় আর এদের কপালে ঘটবেই বা কী? এমন প্রশ্ন যেমন অবৈধ ঘোষিতদের তাড়া করে ফিরছে, তেমনি শঙ্কিত করে তুলেছে প্রতিবেশী বাংলাদেশকেও। কেননা, পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বার বার ভারতের সরকার বলে আসছেন যে এই লোকগুলি বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ বসতিস্থাপনকারী।
কয়েকমাস আগে প্রথম যখন আসামে এই নাগরিক পঞ্জি ঘোষণা করা হয় তখনই বাদ পড়েন ৪০ লাখেরও বেশি লোক। পরে এই সংখ্যার সাথে আরো যোগ হয় লক্ষাধিক লোক। সে সময়ে এ নিয়ে আসামে বাদ পড়াদের মধ্যে শুরু হয় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা। বহু ক্ষেত্রে একই পরিবারের কোন কোন সদস্য সদস্যা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, আবার কেউ কেউ রয়ে গেছেন। রাজ্যটির প্রথম বিধান সবার ডেপুটি স্পীকার মৌলভী আমিন উদ্দিনের পরিবার, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমদের পরিবারের সদস্যরা, সাবেক সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা এমনকি সেনাবাহিনীতে চাকুরি করা বাঙগালী মুসলমানরাও এই তালিকা থেকে বাদ পড়ে এখন অবৈধ নাগরিক হয়ে পড়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা আশস্ত করেছেন যে, বাদ পড়া এই ১৯ লাখ মানুষ ৪ মাস সময় পাবেন তাদের নাগরিকতা প্রমাণের।
এত সব আশ্বাস সত্বেও ভুক্তভোগীরা পড়েছেন মহা শঙ্কায়। প্রথমে যখন তালিকা প্রকাশ করা হয় তখন বাদ পড়া ব্যক্তিরা অনেকেই নানা আদালতে যাওয়া-আসা করেছেন, আশঙ্কা ও অশান্তিতে অনেক মানসিক সমস্যায় পড়েছেন, ঘটেছে দুই চারটি আত্মহত্যার ঘটনাও। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিলতর হচ্ছে। বাদ পড়া লোকেরা, বিশেষ করে মুসলিমরা, নানা হেনস্থার শিকারও হচ্ছেন। তাদের অনেকের বাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে। অনেক অতি উৎসাহী উগ্র স্থানীয়রা বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে মুসলিমদের শুকুরের মাংস চিবিয়ে খেতে বাধ্য করেছে – যা তাদের কাছে হারাম।
ভারত একটি ফেডারেল পদ্ধতির দেশ। অনেকগুলি রাজ্য নিয়ে এই দেশ। কেন্দ্রে ক্ষমতায় রয়েছে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির নরেন্দ্র মোদীর সরকার। ইনি যেমন, তাঁর দলের মহাসচিব অমিত শাহও ঠিক তেমনি কট্টর মুসলিম বিরোধী। আসাম রাজ্যেও বর্তমানে ক্ষমতায় আছে বিজেপি দল। কাজেই এমন একটা কঠিন সিদ্ধান্তের আশংকা আগে থেকেই মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহল করে আসছিলেন।
আসামের বাঙ্গালীদের মধ্যে বেশ কিছু লোক পাওয়া যায় যাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের। আসাম যখন বৃটিশ ভারতের অংশ ছিল তখন ভাগ্যের অণ্বেষণে এই লোকগুলি সেখানে গিয়েছিলেন। অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ময়মনসিংহ জেলা ও আসামের মধ্যে অভিন্ন সীমান্ত। ভাগ্যের অন্বেষণে দেশের এক প্রান্ত থেকে যে কোন প্রান্তে যাওয়া তো অপরাধ হতে পারে না। সেই সময়ে, অর্থাৎ বৃটিশ শাসনকালেই ভারতের বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা, অন্ধ্র প্রদেশ থেকে দলে দলে লোক আসামে গিয়ে বৃটিশদের গড়ে তোলা চা বাগানে কাজ নেন- যারা আর কখনও তাদের ছেড়ে যাওয়া রাজ্যে ফেরেন নি। আসামে এদের নুতন পরিচয় বাগানিয়া হিসাবে। কিন্তু আসামে যাওয়া নদীমাতৃক এলাকার বাঙগালীরা বেছে নেন চাষবাসের কাজ।
আর এক শ্রেণীর বাঙ্গালী আসামে গিয়ে বসবাস গড়ে তুলেছেন – এরা হলেন পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু বাঙ্গালীরা। বিশেষ করে আমাদের সিলেট জেলার নানান অংশ থেকে এরা গিয়ে তখনকার বৃহত্তর আসামে বসতি গাড়েন বৈধভাবেই, কেননা আসাম ভারতেরই একটা অংশ।
মানুষের দেশান্তর নুতন কোন বিষয় নয়। ঔপনিবেশিক আমলে প্রধানতঃ ভাড়া করা শ্রমিক হিসাবে কাজ করার জন্য কখনও কখনও হাজার হাজার মাইল দূরে বিশ্বের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে লোক নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রধান প্রধান উপনিবেশিক শক্তি – যেমন বৃটেন, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানীর মত দেশ এই কাজগুলি করেছে কয়েক শতাব্দী ধরে। যার ফলে আমরা দেখি হাজার মাইল দূরের ক্যারিবীয় অঞ্চল, ভারত মহাসাগীয় দেশ মরিশাশ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ফিজি, ভানুয়াতু, দুক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভূমধ্য সগরের বুকের জিব্রাল্টারসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ ভারতীয়ারা যুগ যুগ ধরে বসতি করছেন, সমৃদ্ধ হয়েছেন। হালের বৃটেনের চিত্রটি কল্পনা করুন। হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে শুরু করে লন্ডন ও অন্যান্য শহরের পথে ঘাটে ভারতীয়দের দেখলে মনে হতে পারে এরাই বৃটেনের আদি অধিবাসী। সংখ্যায় তারা এতই বেশি! পুর্ব আফ্রিকার কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া, ইথিওপিয়ায় লাখো ভারতীয় স্থায়ী অধিবাসী হয়ে কাজ করছেন। স্পেন পর্তুগালে যান, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকায় তাদের কলোনীর অনেক লোক স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। দ্বীপদেশ মরিশাশে ভারতীয়রাই শাসন করছেন। উগান্ডায় এক সময় ব্যবসায়ীদের সিংহভাগ ছিলেন ভরতীয়- গুজরাটি। এইসব দেশ ত ভারতকে বলছে না ভারতীয় বংশোদ্ভুত লোকগুলিকে তোমরা নিয়ে যাও? ভারত সরকারেরই এক হিসাব মতে প্রবাসে ভারতীয়দের সংখ্যা বর্তমানে সোয়া তিন কোটি!
সুদূর অতীত কালে, সম্ভবতঃ সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ অভিযানের পর এবং সমুদ্রগুপ্তের অভিযানের পর ভারতীয়রা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে যার রেশ আজও আছে। বৃটিশ শাসনামলে রেলপথ নির্মাণ ও পাম বাগানে কাজ করার জন্য নেওয়া হয় দক্ষিণ ভারতীয় লোকদের। এইভাবে যুগে যুগে নানা কারণে দেশান্তরের ঘটনা ঘটেছে। এ কারণেই আজ ফ্রান্সে উত্তর আফ্রিকান বংশোদ্ভত এত মানুষ, জার্মাণীতে তুর্কী বংশোদ্ভত এত মানুষ!
ভারতে বর্তমানে যে ২৯টি রাজ্য এবং ৭টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জাতিসত্বাগত লোকের বসবাস আসাম তথা উত্তর-পূর্ব ভারতে। আসাম ভেঙে একে একে আসাম, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, ত্রিপুরা ও মেঘালয় – এই ৭টি রাজ্য সৃষ্টি করার আগে, অর্থাৎ বৃহত্তর আসাম শুধু ভারতের নয় – এটি বিশ্বের অন্যতম ডাইভার্সিংফায়িং এথনিক এরিয়া ছিল। এত জাতিসত্বাগত লোকের বসবাস এই অঞ্চলে যে একে অনেক সময় ‘এ মিউজিয়াম অফ ম্যানকাইন্ড’ বলা হয়।
এখন এই বিপুল সংখ্যক লোকদের কী হবে? বাদপড়া লোকগুলি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। জায়গা জমি থেকে উচ্ছেদ হতে পারেন। কোথায় যাবেন সেই সব বিপুল সংখ্যক লোক? বাদ পড়াদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে, হয়ত তাদের বন্দী শিবিরে নিয়ে যাওয়া হবে, বা বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্ঠা করা হবে। কেউ কেউ বলছেন, চার মাস বেঁধে দেওয়া সময়ের পরও যারা ভারতীয় বলে প্রমাণ করতে পারবেন না – তাদের হয়ত অস্থায়ীভাবে ওয়ার্ক পারমিট বা ভারতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহের অস্থায়ী সমাধান দেওয়া হতে পারে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাই কমিনিশার মি. গ্রান্দে কাউকে রাষ্ট্রহীন না করার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। ভারতের অনেক বিরোধী নেতা এবং মানবাধিকার কর্মী এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে বিদেশী তকমা দেওয়ার বিপক্ষে কথা বলছেন। আশা করি, মোদি সরকার জেনোফোবিয়াক বা উগ্র জাত্যাভিমানী বাগাড়ম্বর থেকে সরে এসে মানবিক পদক্ষেপ নেবেন।
আসামে উগ্র জাতীয়তাবাদ আজকের নয়। আসামের লোকেরা ভারতের অন্যান্য অংশের লোকদেরকেও ‘বিদেশী’ মনে করে। তারা মনে করে তেল ও অন্যান্য সম্পদে সমৃদ্ধ আসামকে শোষণ করছে এই সব বিদেশী। উলফাসহ বেশ কয়েকটি দল আসামের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করছে ৪০ বছর ধরে। এই চার দশক ধরেই নানা সময়ে নয়া দিল্লী সরকারের সাথে স্বাধীনতা-প্রত্যাশী এইসব দলের আলোচনা হয়। আসামে এখনও মাঝে মাঝে রেললাইন ও অন্যান্য সরকারী স্থাপনায় এই গেরিলারা হামলা চালান। একবার তামাবিল-ডাউকি পথে মেঘালয় হয়ে আসাম যাওয়া পথে আমাকে একটা পুরা দিন সীমান্ত শহর ডাউকীতে কাটাতে হয়েছিল। সেখানে কর্মরত বিহার রাজ্যের এক স্কুলশিক্ষক আফসোস করছিলেন যে, আসামসহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকেরা ভারতের অন্যান্য এলাকার লোকদের বিদেশী ভাবে এবং রাতে তারা অবাধে চলাচল করতে পারেন না। এই কথার সত্যতা পেয়েছিলাম মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। সঙ্গীনসহ রাইফেলধারী সিআরপির আধা সামরিক বাহিনীর লোকেরা ছাড়া এবং দুই চারটি কুকুর ছাড়া পথে অন্য কোন প্রাণীর সাড়া নেই। পরে জেনেছি এই অবস্থা চলছে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। তারা সকল বিদেশীকে খেদাবেই। কাজেই বাঙ্গালী মুসলমানদের খেদালেই আসামের আদি লোকেরা শান্ত হবে এমন সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
এমনিতেই দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নিয়ে বিপদে বাংলাদেশ। তার উপর এই নাগরিকপঞ্জী ঘোষিত হওয়ার পর ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি দলের প্রধান এবং দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর হুঙ্কারমতে শেষমেষ আসামের বাদ পড়া বাঙ্গালীদের যদি বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ পড়বে আরো মহাবিপদে।

এবিএস

Comments are closed.