rockland bd

ধর্ষণ বন্ধে চাই সামাজিক আন্দোলন

0


মানুষ যখন থেকে আগুনের ব্যবহার শিখলো তখন থেকেই তার সভ্যতার মহাসড়কে পথচলা শুরু। আগুন অবিস্কার ও তার ব্যবহার মানুষকে তার মস্তিস্ককে কাজে লাগাতে শিখিয়েছে। বলা চলে, ভালো-মন্দো বিচার বিবেচনা করতে পারার দক্ষতা মানুষ ঠিক তখন থেকে রপ্ত করেছে। মানুষ তার বুদ্ধিমাতাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতিকে জয় করেছে। পৃথিবীকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। সভ্যতার উন্নতির চরম শিখরে উন্নত মানুষ নিজের বুদ্ধিমাত্তাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি কৃত্তিম বুদ্ধিমাত্তাকে কাজে লাগাচ্ছে। পশু শিকার সমাজ থেকে আজ আমরা গ্লোবাল ভিলেজ সমাজে বাস করছি। কিন্তু আদতে সভ্যসমাজে বসবাসরত মানুষ কী সভ্য হয়েছে? বিশেষ করে পুরুষেরা? পুরুষেরা কী তার স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারছে?
সম্প্রতি দেশ ব্যাপী ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিবেচনাই নিলে তা মনে হয় না। ঘটনার ভয়াবহতায় আতকে উঠতে হয়। কী হচ্ছে দেশে! ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন কোন নারী লেখে- কুকুরের কার্তিক মাস শেষ হয় কিন্তু পুরুষের লালসার জিভের জল শেষ হয় না। তখন পুরুষ হিসেবে বড্ড বেশী অসহায় লাগে। ধর্ষক আর কুকুরের মধ্যে কোন পার্থক্য আসলেই কী করা যায়? উভয়ই কাম তাড়িত হয়ে হিতাহিত শুন্য উন্মত্ত জানোয়ার। বস্তুত, পাশবিকতা ও মানবিকতা দু’টিই মানুষের বৈশিষ্ট্য। পাশবিকতা জয় করে মানুষ যখন মানবিক হয়ে ওঠে তখনই মানুষ নিজেকে প্রকৃত মানুষ বলে দাবি করতে পারে। মানবিক বোধ শুন্য মানুষ আর পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে অবস্থা দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মানুষের মধ্যে মানবিকতা বোধ ভয়াবহ হারে লোপ পাচ্ছে।
দু’টি ঘটনা বিবেচনায় নেয়া যাক। প্রথমটি-চুয়াডাঙ্গায় চকলেট দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ছয় বছরের এক মেয়ে শিশুকে ধর্ষণ করেছে ৫৫ বছরের নরপশু আবদুল মালেক। ঘটনার সময় মালেকের বাড়ি ছিল মহিলা ও মানুষ শুন্য। অপরটি-মাগুরায়। স্বামী বাড়ি না থাকায় এক মা তার শিশু সন্তানকে নিয়ে নিজ বাসায় রাত্রি যাপন করছিল। এই সুযোগে একই গ্রামের দিপুল, মাজেদুল ও আশরাফুল নামধারী তিন নরপশু মহিলাটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। প্রথম ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা ও সফলতা চোখে পড়ার মতো এবং তা প্রশংসার দাবি রাখে। দ্বিতীয় ঘটনায় মাগুরার শ্রীপুর থানার ওসি মহিলাটির মামলা না নিয়ে উল্টো নির্যাতিতার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে থানা থেকে বিদায় করেছেন। দু’টি ঘটনায় প্রশাসনের দুই রকম ভূমিকা থাকলেও একটা বিষয়ে চরম মিল আছে। তাহলো, পরিবেশ ও সুযোগ অনুকূলে আসা মাত্রই পুরুষগুলো পশুতে পরিনত হয়েছে।
ধর্ষণ বৃদ্ধি পাবার বহুবিধ কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে-দেশে যৌন শিক্ষা মূলত সমবয়সী বন্ধু কেন্দ্রিক। এই উপমহাদেশে না পরিবার-না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথাও যৌনতা নিয়ে কথা বলার পরিবেশ নেই। ফলে বন্ধুদের কাছে শোনা যৌনতার জ্ঞান একধরণের ফ্যান্টাসি তৈরী করছে। ফলে কোন পিয়ার গ্র“পের একজন ধর্ষণ করার অভিজ্ঞতা লাভ করলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও তা করার প্রবনতা বৃদ্ধি পায়। যৌনতা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রযোজন। একথা দেশের নীতিনির্ধারকরা ভাবেন বলে মনে হয় না। ফলে দেশে শিক্ষিত থেকে অক্ষর জ্ঞনশুন্য সকলেই একই পন্থায় যৌন শিক্ষা লাভ করছে। ফলাফল, সচিব থেকে শ্রমিক কে নেই ধর্ষকের তালিকায়। আত্মীয়তা ও রক্তের বাঁধনও এক্ষেত্রে কাজে আসছে না। ধর্ষকের মিছিলে বাবা-শ্বশুর,চাচা-মামা-খালু,কাজিন সবাই সামিল হচ্ছে। এক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষিতদের শিক্ষাও কোন কাজে আসছে না। কলাবাগান থেকে ক্যান্টনমেন্ট, নিজ গৃহ থেকে চলন্ত গাড়ি কোথাও নারী আজ নিরাপদ না।
ইন্টারনেট হলো যৌন শিক্ষার আর এক মাধ্যম। স্মার্ট ফোন সহজলোভ্য হওয়ায় তা মহামারী আকারে মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছে। বলা বাহুল্য, ইন্টারনেটে ভালো জিনিসের চেয়ে খারাপ জিনিসই বেশি শেখে মানুষ। এর সাথে যোগ হয়েছে দেশের গ্রাম থেকে শহরের অলিগলি সবখানে কম্পিউটারের দোকানে পর্ণগ্রাফির রমরমা ব্যাবসা। এসব দোকানে দশ টাকা দিয়ে যেকেউ স্মার্টফোন ভর্তি করে পর্নো ছবি আপলোড করে নিতে পারে। স্মার্টফোন যেহেতু সারাক্ষনের সঙ্গি তাই যখন খুশি তখন ফোনের মালিক এসব ছবি দেখার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে এসব নীল ছবির দর্শকদের মনোবিকৃতি ঘটছে ও তাদের পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনছে। দেশে নিষিদ্ধ নীল ছবি বেচাকেনা বন্ধে কারও কোন বিকার নেই। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সাবেক ইউএনও মোঃ শাহীনুজ্জামান একবার এই ব্যাবসা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এটাই সম্ভবত সবে ধন নীল মণি। দেশের অন্য আর কোন ইউএনও-ডিসি পর্নো ছবির বেচাকেনা বন্ধ করতে চান কিনা বা এ বিষটি তাদের নজরে আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ হয়।
সবক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে গ্রাস করছে। মানব জীবনে এই মাধ্যমের প্রভাবকে আর অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এই মাধ্যমে যে কোন ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নিমিষেই। ফলে কোথাও কোন ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে অন্যরাও ঘটনার সাথে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সাথে মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ অন্যদেরেও ধর্ষণে প্রলুব্ধ করছে। সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য গ্র“পে যৌন উত্তেজনার শুরশুরি দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ধর্মের দোহায় আজ আর কোথাও কাজে আসছে না। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলাও সমাজে ধর্ষণ বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
রাজনীতি করলে আর দল ক্ষমতায় এলে অসীম ক্ষমতার অধিকারি হওয়া যায় এ দেশে। ক্ষমতাধরদের মধ্যে ধরাকে সরা জ্ঞান করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রতিপক্ষের মা-বোনদের ধর্ষণ করে ক্ষমতা প্রকাশ করার বরবর সংস্কৃতি এ দেশে গড়ে উঠছে। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পূর্ণিমা শীলকে বিএনপির খলিল, লিটন, আলতাফরা ধর্ষণ করে। কারণ, সকল হিন্দু নৌকায় ভোট দেয়। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে পারুলকে আওয়ামী লীগের রুহুল আমীন মেম্বর ও তার দলবল ধর্ষণ করে। কারণ, পারুলকে বলা সত্তেও সে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। ক্ষমতা উৎযাপনের এই পৈশ্বাচিক প্রবণতা যে কারণে গড়ে উঠছে তা হলো বিচারহীনতা।
বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের যেন মুক্তি নেই। আনেকের মনে থাকার কথা ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিক ক্যাম্পাসে মিষ্টি বিতরন করে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন করেছিল। সে ছিল বিশ্ববিদ্যলয়টির তৎকালীন প্রক্টরের ভাগ্নে। কথায় আছে, মামা ভাগ্নে যেখানে আপদ নেই সেখানে। এদেশে মানিকের বিচার হয়নি। রাষ্ট্রের দুর্বোলতার সুযোগ নিয়ে সে বিদেশে পালিয়ে নিরাপদ জীবন গড়েছে।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতর সোহাগী জাহান তনু ধর্ষিত ও খুন হলো। বিচারতো দূরে থাক অবস্তাদৃষ্টিতে মনে হতে বাধ্য,‘ নো ওয়ান কিলড তনু’। চলন্ত বাসে কিশোরগঞ্জের তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাই এদেশে কোন সাড়া ফেলেছে বলে মনে হয়নি। অথচ ২০১২ সালে দিল্লিতে চলন্ত বাসে জ্যোতি সিংহ পান্ডেকে গণধর্ষণের ঘটনায় ভারতবর্ষ ফুসে উঠেছিল। ইন্ডিয়া গেটের সামনেসহ সারা ভারতে ঘটনাটির বিচার চেয়ে বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শনের করে। এই ঘটনার বিচার হয়েছে। অভিযুক্তদের ফাঁসি হয়েছে। ফেনীর নুসরাতকে যৌন হয়রানি ও পুড়ি হত্যার ঘটনায় আমরা শুধু হতবাক হয়েছি। আন্দোলন করার প্রয়োজন বোধ করিনি।
সমাজে ছড়িয়ে পড়া অনাচার বন্ধে সকলকে সচ্চার হতে হবে। তা না হলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলারা আমাদের সকলকে একসময় পুড়িয়ে মারবে। দেশে বাড়তে থাকা ধর্ষণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। তা করতে সামাজিক আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। পরিবার-সামাজসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বক্ষেত্রে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। একসময় আমাদের দেশে এসিড সন্ত্রাস মহামারী আকার ধারণ করেছিল। ‘এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২’ এ এসিড নিক্ষেপের শাস্তি— মৃত্যুদন্ড করার পর এর প্রকোপ কমে এসেছে।
সরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ‘সত্যমেব জয়তে’ টিভি প্রোগ্রামের মাধ্যমে বলিউডের সুপারস্টার আমির খান শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির চিত্র তুলে ধরার সাথে সাথে শিশুদের যৌন শিক্ষা দেওয়ার প্রয়াস করেছেন। সোহেল তাজ তার ‘হটলইন কমান্ডো’ প্রোগ্রামে এমনটি করলে আমরা খুশি হব। সবধরণের গণমাধ্যমকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে গণসচেতনতা তৈরীতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
সেঞ্চুরিয়ান মানিকের কান্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে স্মরনে রাখতে ও আর যাতে কোন মানিক তৈরী না হয় এজন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ আগস্ট ‘খুনি ও ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস’ পালন করা হয়। এই দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ‘জাতীয় খুনি ও ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা যেতে পারে। যৌন শিক্ষাকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন আর যথাযথ শিক্ষাই পারে ধর্ষণের অভিসাপ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। সাথে সবার আগে পুরুষকে মানুষ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে।

Comments are closed.