rockland bd

মোদির নয়া ভারত, বিশ্বাস অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ

0

নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি পৃথীবীর বৃহত্তম সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নিয়েছেন। এবার তার সরকারের স্লোগান- সবকা সাথ সবকা বিকাশ সবকা বিশ্বাস। এই স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি নয়া ভারত বিনির্মাণের ডাক দিয়েছেন। এর আগে ২০১৪ সালে ভারতের ষোড়শ সাধারণ নির্বাচনে জিতে ভারতের পঞ্চদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন-সবকা সাথ সবকা বিকাশ।

প্রথম দফায় দেওয়া ওয়াদা তিনি সবটা রক্ষা করতে পারেননি। সবার বিকাশ তিনি সমানভাবে করতে পারেননি। এর প্রমাণ ভারতে ঋণভারে জর্জরিত কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যা করার ভয়ংকর প্রবণতা তিনি থামতে পারেননি। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌরে কৃষিঋণ মকুবের দাবিতে বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে নিহত পাঁচজন কৃষকের আত্মা আমাদের একথায় বলে। দেশটিতে সংখ্যালঘু সম্প্রাদায়ের ওপর নির্যাতন অতীতের যেকোন সরকারের আমল থেকে বেড়েছে তার সময়। বিশেষ করে, গোরক্ষক কমিটি কর্তিক মুসলিম ও দলিত সম্প্রাদায়ের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা না বললেই নয়। পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটস(পিইউডিআর) এর এক প্রতিবেদন মতে, ভারতে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত গোরক্ষার নামে বাড়াবাড়ির মোট ১৩৭টি ঘটনা ঘটেছে, যাতে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের।

তার সরকারের আমলে ভারতে সংখ্যালঘু সম্প্রাদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া তারবেজ আনসারির নির্যাতন ও তাকে হত্যার ঘটনা তার বড় প্রমাণ। এই ধরণের আরও নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ভায়রাল হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির বিকাশে তার অবস্থান স্পস্ট নয়। এরসাথে মোদির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হলো দেশের সংখ্যালঘু মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলা নির্যাতন থামানো, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সবার বিশ্বাস অর্জন করা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের বিশ্বাস তিনি কিভাবে অর্জন করেন তাও দেখার বিষয়। যেখানে এবার দ্বিতীয়বার নির্বাচনী বইতরনী পার হবার তার প্রধান ট্রামকাড ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চালানো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক।

নিকট অতীতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি(এনআরসি) তালিকা করে আসাম রাজ্যের চল্লিশ লক্ষ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যাদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলমান। এদেরকে সেখানে চিহ্নিত করা হচ্ছে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ হিসেবে। বিজেপির রাজনীতিবিদরা এদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে ঘোষণাও দিয়েছেন ইতমধ্যেই। রোহিঙ্গাদের মতো ভারতও তার দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠিকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাবে কিনা সে ভাবনা বাংলাদেশের সচেতন মহলে শঙ্কা তৈরী করেছে। এছাড়া সীমান্তে হত্যা, বাণিজ্যঘাটতি, গঙ্গা, তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদী অববাহীকায় বাংলাদেশকে তার ন্যয্য পানির হিস্যা না দেওয়ার মতো পুরাতন অবিশ্বাসতো আছেই। এগুলোর সাথে রোহিঙ্গা ইসুতে ভারতের অবস্থান তার বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে হতাশ করেছে।

প্রতিবেশীদের সাথে ইন্ডিয়ার আচরণ- বিড়ালের সামনে বাঘ আর বাঘের সামনে বিড়াল, টাইপের। চীন সীমান্তে ভারতের সংযত আচরণ দেখলে আপনার নিজেরই বিশ্বাস হবে না এরাই বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতিনিয়ত ফেলানীদের লাশ বানাচ্ছে। নেপালীদের ভারত সম্পর্কে অভিযোগের শেষ নেই। দুর্বল প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের আচরণ বড় ভাই সুলোভ ও দাদাগিরি টাইপ। আয়তনে ভারত বিশাল তারপরও প্রতিবেশী স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সবাই বন্ধুত্বসুলোভ আচরণ প্রত্যাশা করে।
পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কূটকৌশলের মারপেচে বন্দি।
মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ পুরনো। মায়ানমারের আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করে দেশটির মাটিতে জঙ্গি দমনে অতীতে সার্জিকাল স্ট্রাইক চালিয়েছে ভারত। দেশটিতে তারা চীনের সাথে প্রভাববলয় বৃদ্ধির খেলায় লিপ্ত।

আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে গিয়ে পুরনো শত্র“ পাকিস্তানের সাথে কাশ্মির ছাড়াও সমস্যার নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। চীনের সাথে তিব্বত ও অরুনাচল প্রদেশসহ সীমান্ত নিয়ে ভারতের বিরোধ অনেক আগের। প্রতিবেশীদের মধ্যে শুধু ভূটানের সাথে ভারতের সম্পর্ক স্থিতিশীল। এর প্রধান কারণ ভারতের সাথে ভূটানের সাক্ষর করা প্রতিরক্ষা চুক্তি। যে চুক্তির আওতায় ভূটানকে ভারত নিরাপত্তা ও বিদেশীদের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে থাকে। ১৯৪৯ সালে সাক্ষরিত ও ২০০৭ সাথে নবায়ন করা এই চুক্তির ফলে ভূটান মূলত ভারতের পকেটে ডুকে আছে।

‘নেকলেস পলিসি’ দ্বারা চীন ভারত মহাসাগরে ভারতকে ঘিরে ফেলতে চায়। এই লক্ষ্যে চীন পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মায়ানমার ও বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে সচেষ্ট। এছাড়াও চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পও ভারতের জন্য চিন্তার কারণ। চীনের চলমান এই দু’টি পলিসিকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ভারতকে তার প্রতিবেশী দেশসমূহে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। ফলে দেশগুলোতে ভারত বিরোধীতা যে নতুন মাত্রা পাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মজার ব্যাপার হলো ভারতের প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের জনগণ ভারতে চিকিৎসা সেবা পেতে ও ভ্রমণ করতে পচ্ছন্দ করে কিন্তু দেশটিকে ঠিক সেই অর্থে পচ্ছন্দ করেনা।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান অবস্থা- কুল রাখি না শ্যাম রাখি। দেশটির পুরনো ও সময়ের পরিক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়া। সম্প্রতি সময়ে দেশটি রাশিয়াকে পাশকাটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকেছে। স্টকহোমের ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদন মতে, ভারত বিশ্বের এক নম্বর অস্ত্র ক্রেতা দেশ। আর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর অস্ত্র বিক্রেতা দেশ। ফলে দেশ দুটির মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক। এখানে ভারতের সমস্যা হলো- বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার আর শত্র“ দরকার হয় না। ভারত তা টের পেতে শুরু করেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ট্রায়াস্ফ বিমান প্রতিরোধ ব্যবস্থা কেনা কে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের পর ভারতের সাথেও বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে।

এবছর ভারতের নির্বাচনের আগে ১৪ ফেব্র“য়ারি ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলাওয়ামায় আত্মঘাতী হামলায় ভারতের আধাসামরিক বাহিনীর ৪০ জনের বেশী সদস্য নিহত হল। এর জবাব দিতে ভারত ১২ টি মিরেজ ২০০০ জেট বিমান নিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে আকাশ পথে সার্জিকাল স্ট্রাইক চালালো। ফলাফল ভারতের বিমান ভূপাতিত, পাইলট অভিনন্দন আটক। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খাঁন পাইলট অভিনন্দনকে দ্রুত ভারতের কাছে হস্তান্তর করে তার রাজনৈতিক পরিপক্কতার প্রমাণ দিয়ে সারা বিশ্বের প্রশংসা পেয়েছেন। আর যে বিমানগুলো দিয়ে পাকিস্তান ভারতের এই অভিযান ব্যর্থ করে দিয়েছিল সেই এফ-১৬ বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের।

পাকিস্তানের কাছে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমানগুলো সাথে চীনা বিমান বাহিনীর সাথে টক্কর দিতে ভারত ফ্রান্স থেকে রাফায়েল যুদ্ধবিমান ক্রয় করছে। পাকিস্তানে হামলার ঘটনার পর নরেন্দ্র মদি বলেছিলেন, রাফায়েল বিমান থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতো। এখানে মনে রাখা ভালো, ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছিলো পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্র। রাশিয়ার সাথে ভারতের বন্ধুত্বও ঠিক তখন থেকেই। আর বর্তমানে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স ভারতের সব থেকে কাছের বন্ধু। রাশিয়ার বন্ধুত্বও ভারত একেবারে ছাড়তে চাচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্রসমুহেরও নিরেট বিশ্বাস অর্জন করা ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে রাশিয়ার সামরিক মহড়া এটাই প্রমাণ করে ভারতের প্রতি রাশিয়া আর শতভাগ আস্থা রাখতে পারছে না।

রাফায়েল বিমান কেনা কে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে সরগরম কম হয়নি। এই বিমান কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে- এই অভিযোগে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধী মোদিকে দুর্নীতিবাজ, অনিল আম্বানির প্রধানমন্ত্রী, গলি গলি মে শোর হ্যায়, চৌকিদার চোর হ্যায় বলে বলে নির্বচনী মাঠ গরম করে ফেলেছিল। কিন্তু তা হালে পানি পায়নি। দুর্নীতি কমাতে বিমুদ্রাকরণ করে ১০০০ রুপির নোট বাতিলের ঘটনায় জনদুর্ভোগ, গণেশ দেবতার মাথায় হাতির মাথা থাকা প্রাচীন ভারতে প্লাস্টিক সার্জারির প্রমাণ, খারাপ আবহাওয়ায় পাকিস্তানের রাডার ব্যবস্থা কাজ করবে না, এতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সুবিধা হবে- এ ধরণের অবৈজ্ঞানিক ধারণা পোষণ জনমনে মোদি সম্পর্কে বিভ্রান্ত সৃষ্টি হলেও এবারের নির্বাচনে তার কোন প্রভাব পড়েনি। বরং ফল হয়েছে উল্টো। নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদিকে ভারতের জনগণ দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছে।

গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মোদির ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ধারণা তা তিনি কখনই বদলাতে পারবেন না। তার হাত ধরে ভারতে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছে। ভারতের দেখাদেখি মৌলবাদী রাজনীতির এই বিষবাস্প দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে-এই আশঙ্কা অনেকের। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মতো পাকিস্তানেও ইসলামী বিপ্লব ঘটানোর ইচ্ছা পোষণ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও মৌলবাদী শক্তির উত্থান সময়ের প্রহর গুনছে। আফগানিস্তানে তালেবানরা আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসছে। যা ভারতের জন্য মোটেও সুখবর না। দেশের আপামর জনগণের, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের ও আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের বিশ্বাস অর্জন দ্বিতীয় মেয়াদে মোদির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

Comments are closed.