rockland bd

হাইব্রিড গণতন্ত্র

0

হাইব্রিড কথাটি পজিটিভ অর্থেই ব্যবহৃত হয় সাধারণত। বর্তমান পৃথিবীতে শস্য-সবজি, গাড়ি থেকে শুরু করে ওয়েব দুনিয়া সব ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত শব্দ এটি। জাতীয় কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)’র তথ্য মতে, অধিক ফলন, আকর্ষণীয় চেহারা, স্বল্প জীবনকাল, বিভিন্ন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা, রোগ ও পোকার অধিক সহনশীলতা, প্রায় একই সময়ে পরিণত হওয়া, বাজারে অধিক চাহিদা, পুষ্টিকর ইত্যাদি নানাবিধ কারণে হাইব্রিড জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দিনদিন। জনপ্রিয় এই ধারণাটি কিন্তু রাজনীতিতে ব্যবহৃত হয় নেগেটিভ অর্থে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের হাইব্রিড বলে একগাল গালমন্দ করা হয় দলে সমস্যা দেখা দিলেই। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের হাইব্রিডদের ‘কাওয়া’ সম্বোধন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। রাজনীতিতে হাইব্রিডরা হলো সুযোগ সন্ধানী। এরা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকতে চায়। এদের কাছে নীতি, আদর্শ, দল বড় কথা নয়। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকে এরা রান্নকরা মাছের মাথাটি খেতে চায়। এদের দাপটে কাদা-জল মেখে যেসব নিবেদিত দলীয় অন্তঃপ্রাণ নেতাকর্মী ক্ষমতা নামক মাছটা কড়াই পর্যন্ত নিয়ে আসে, তারা বঞ্চিত হয়ে পড়ে।

হাইব্রিড নেতার সমস্যা দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলেই বিদ্যমান। এদের দাপটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকর্মী রাজনীতি থেকে অনেকটা স্বেচ্ছা অবসরে চলে গেছেন। আর বিএনপি কাছে এটি হাইব্রিড না বলে পরগাছা সমস্যা বলাই যুক্তিযুক্ত। দলটির শরিক দল জামাতের নেতাকর্মীদের দাপটে মূল বিএনপির নেতাকর্মীরা বিলিন হওয়ার পথে। মৌসুমী ও সুযোগসন্ধানী এসব হাইব্রিড ও পরগাছা নেতাকর্মীদের দাপটে দেশের রাজনীতির চেনা মাঠ বড় বেশি অচেনা মনে হয়। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আমাদের গণতন্ত্রের উপর পড়ছে।

দেশে বিদ্যমান গণতন্ত্র নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। একদিনের গণতন্ত্র, নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র বির্বচনের ব্যবস্থা, নির্বাচনী গণতন্ত্রসহ অনেক নামেই ডাকা হয় একে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের ভাষায় বিদ্যমান গণতন্ত্র হলো,‘ স্বৈরাতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের’ ব্যবস্থা। আবার, ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট(ইআইইউ) এর বৈশ্বিক প্রতিবেদন মতে,‘হাইব্রিড গণতন্ত্র’। হাইব্রিড গণতন্ত্র বলতে, এমন ব্যবস্থা বোঝায়- যেখানে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা প্রায়ই ব্যাহত হয়। এ ছাড়া বিরোধীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ, দুর্নীতি, আইনের শাসন ও নাগরিক সমাজ দুর্বল। হাইব্রিডের ইন্ডিকেটরগুলোর বিশ্লেষণ ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিলিয়ে নেওয়ার ভার সচেতন পাঠকের কাছেই রইলো।

আমাদের গণতন্ত্র যে দুর্বল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে নির্বাচন যত কাছাকাছি হয় গণতন্ত্রের দুর্বল দিকগুলো তত বেশি প্রকাশিত হতে থাকে। নির্বচন এলেই- কী হবে এবার? ভাবনায়, সংশয় ও সংকটের দোলাচলে সাধারণ জনগণ পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার টিকবে কি টিকবে না তা নির্ভর করে জনগণের ইচ্ছার উপর। আমাদের দেশে বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হয়, ব্যবসায়ী,আমলা ও দরবেশদের চাওয়াই হলো শেষ কথা।

দশম জাতীয় সংসদের কথা ধরা যাক। দশম সংসদের মূল ৩০০ জন সাংসদদের মধ্যে ২০৬ জনই ছিলেন ব্যবসায়ী। সংরক্ষিত নারী আসনসহ সাংসদদের পেশার চিত্র হলো, ব্যবসায়ী ২১৪ জন, আইনজীবী ৪৮ জন, রাজনীতি পেশা ২২ জনের ও অন্যরা। শতাংশের হিসেবে, ব্যবসায়ী এমপির হার ৬৯ শতাংশ। সাংসদের সবাই যে কোটিপতি তা সহজে অনুমেয়। কোটিপতি এসব ব্যবসায়ী রাজনীতিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ও অধিক মুনাফা ছেঁকে তোলার জালের পরিধি বিস্তৃত করতে মনোযোগী হওয়টাই স্বাভাবিক। ফলে প্রকৃত গণতন্ত্র নিয়ে কারও মাধাব্যাথা নেই।

দশম সংসদের পরিসংখ্যানই বলে দেয়, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ীদের পকেটে। বলার অপেক্ষা রাখে না ব্যবসায়ীদের প্রধান লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন। হচ্ছেও তাই। ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে। বিশ্বে অতিধনী বৃদ্ধির প্রবনতায় বাংলাদেশর এক নম্বরে ( ১৭.৩%) অবস্থান এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ফলে দেশে সম্পদের সুষম বন্টন হুমকির মুখে। কতিপয় ব্যবসায়ী ও তাদের স্টেকহোলডাররা দেশের অধিকাংশ সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে। ফলে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ সম্পদ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কোথাও কোন উত্তাপ আমরা দেখিনি। একধরনের নিরবতা আপনি কান পাতলেই এখনও শুনতে পাবেন। এই সুযোগে, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, তারকা খেলোয়ার থেকে তারকা কমিক চরিত্র ও অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী সাবেক আমলারা নমিনেশনের ইঁদুর দৌড়ে প্রধান আলোচনায় ছিলেন। সাবেক সেনাকর্মকর্তা, এফবিসিসিআই, বিজিএমই, বিকেএমই, স্বর্ণ ব্যবসায়ী, ব্যাংক,বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পগ্র“পের মালিকসহ কে ছিল না সেই আলোচনার পদ প্রদীপে।

একাদশ জাতীয় সংসদেও সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬৩.৩৩ শতাংশ ব্যবসায়ী। এদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবার পোশাকশিল্প ব্যবসায়ী। ফলে এবছরের অর্থাৎ ২০১৯-২০২০ সালের বাজেট পোশাকশিল্প খাতে ভর্তুকি বাবদ বাজেটে বরাদ্দ ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। যেখানে দেশের প্রাণ কৃষকরা উপেক্ষিত রয়েগেছে। এবারের বাজেট দেখে মনে হয় দেশের একটা বিশেষ ধনীক শ্রেণীকে সুবিধা দিতেই যেন তা প্রণয়ন করা হয়েছে। যদিও দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া ভিন্ন।

নির্বাচন এদেশে চরম আকাঙ্খিত একটি অনুষ্ঠান। বর্তমান বাস্তবতা হলো, দেশে কোন নির্বাচন এলে এলাকার সৎ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈকতিক নেতা-কর্মীরা থাকে দর্শকের ভূমিকায়। তাদের সান্ত্বনার নাম তৃণমূল। সরাজীবন রাজনীতি করে জেল-জুলুম ভোগ করে এরা তৃণমূল! তৃণমূলের কাজ হলো, নমিনেশন চুড়ান্ত পর্বের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকা। দেখা, কোন বড় ব্যবসায়ী বা টাকা ওয়ালা এমপি, মেয়র বা উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে চুড়ান্ত হচ্ছেন। অবস্থা এমন, তৃণমূল রাজনীতির বৃক্ষটিকে পরিচর্যা করে ফল ধরাবে আর অন্য একজন ধুমকেতুর মতো হাজির হয়ে, গাছে উঠে ফল খাবে। তাহলে মাঠ পর্যায়ে রাজনীতি করে কী লাভ? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর না পেয়ে এখন সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা টাকা কামানোর দৌড়ে নিজেদের সামিল করে নিচ্ছে।

লাভ-ক্ষতির ঝুকির প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কবলে দেশের গণতন্ত্র ও শাসন ব্যবস্থা। প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চার অনুকূল পরিবেশ বর্তমান ব্যবস্থা দিতে পারছে না। এই সুযোগে সুযোগসন্ধানীরা ঘোলা জলে মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শের চর্চা করার সবচেয়ে কঠিন সময় এসে গেছে। সময় থাকতেই শক্তিশালি পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে রাজনীতি আর কোন ভাবেই রাজনীতিবিদদের হাতে থাকবে না। চলে যাবে দূর্বৃত্তদের বুকপকেটে ও ম্যানিব্যাগে।

দেশের রাজনীতি ও সকল সুযোগ সুবিধা বিশেষ একটা শ্রেণীর পকেটে যে চলে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। হিরো আলম যেমনটা বলেছিলেন, এমপি-মন্ত্রীরা চায় না প্রজারাও রাজা হোক। হিরো আলম শ্রেণী বৈষম্য ও শ্রেণী সংগ্রাম নিয়ে তার মতো করে বলেছে। জিরো থেকে হিরো হয়েছে সে। সে কোন সাবেক এমপি-মন্ত্রী বাবা-মায়ের সন্তান না। প্রবাস থেকে টাকার থলে হাতে দেশে আসেনি। কয়লা-ব্যাংক-শেয়ারবাজার খেয়ে ফেলেনি। বিদেশে টাকা পাচারসহ সেকেন্ড হোম বানায়নি। নির্বচন যখন করবো, বড়টাই করবো-ফরম ক্রয় পর্বে হিরো আলোম এমনটাই বলেছিলেন। বড় নির্বাচন ঠিক কতখানি বড়, তা তিনি এখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন।

গণতন্ত্রে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ নির্বাচন সবার আগে জরুরি। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরী কাজটি করতে হয় নির্বাচন কমিশনকে। এবছর রোজার সময় সংস্থাটি ইফতার আয়োজন করে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ও বিশেষ ও সাধারণ মেনু পরিবেশন করেছে। এ নিয়ে অনেক কলমজীবী জাতীয় পত্রিকাগুলোতে কলাম লিখে প্রশ্ন রেখেছেন, যারা ইফতারির মতো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সকলের জন্য সমান খাবারের মেনু পরিবেশন করতে পারে না তারা কিভাবে নির্বাচনের মতো একটি জটিল কর্মে নিরপেক্ষতা দেখাবেন? আমাদের দুর্ভাগ্য দেশে প্রতিবেশী ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের মতো একজন মেরুদন্ড ওয়ালা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এখন পর্যন্ত দেখা নেই। বড় চাওয়া! পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষার দীর্ঘ প্রহর গণনাতো করতেই হবে।
দেশে এখন উপজেলা নির্বাচন চলছে। প্রধান বিরোধী দল(সাধারণ মানুষের মতে) বিহীন নির্বাচন কেমন হচ্ছে? এ বিষয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগর নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। উপজলা নির্বাচনেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটারদের আনা যায় না।

সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকাগুলোর পরিবেশিত নিউজগুলোই একটা ছবি খুব কমন- ফাঁকা নির্বাচন কেন্দ্রে কুকুর ঘুমাচ্ছে। বলা হয়, কুকুর খুবই প্রভুভক্ত প্রাণী। কোন কারণে কুকুরের প্রভু যদি মারা যায় বা তাকে ছেড়ে গোপনে অন্যত্র চলে যায় তারপরও সে প্রভুর ভিটা পাহারা দেয়। এর বিপরীত চরিত্র বিড়ালের। প্রভু মারা গেলে বিড়াল অন্যত্র চলে যায়। যেকোন নির্বাচন এ দেশে একসময় উৎসবের মতো ছিল। সাধারণ জনগণের এই নির্বাচন বিমুখীতা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক। গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের স্বার্থে নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বচন খুব জরুরী।

নিরপেক্ষতার বিপরীত পক্ষপাতিত্ব বিষয়টি এমন- তা আপনার পক্ষে গেলে টের পাবেন না, আর যদি বিপক্ষে যায় তবে তা অবশ্যই টের পাবেন। পক্ষ-বিপক্ষের চলমান দ্বদ্বে কোনভাবেই যেন আমাদের গণতন্ত্র হোচট না খায়। সেদিকে সকল পক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্বাচনী উৎসবের শতরং দেশ ব্যাপি আবার ছড়িয়ে দিতে হবে ইসিকেই। রাজনীতিবিদ ও ইসিকে মিলেই এই কাজটি করতে হবে। তারা যদি তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে হাইব্রিড গণতন্ত্রের মানদন্ডেই ঘুরপাক খেতে থাকবে দেশের গণতন্ত্র।

Comments are closed.