rockland bd

‘ইনন পরিকল্পনা’ ও জ্বলন্ত মধ্যপ্রাচ্য

0

মোহাঃ হারুন-উর-রশিদ :
সম্প্রতি সময়ে হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজের উপর হমলার ঘটনা বাড়ছে। কে বা কারা এ হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে তা জানা না গেলেও- ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল প্রতিটি হামলার জন্য ইরানকে একতরফাভাবে দোষারোপ করছে।

পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সাথে অপর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আলিংটন মোতায়ন আছে। সাথে কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়ন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনা মোতায়নের ঘোষণা দিয়েছে ক’দিন আগেই। এই সংখ্যক সেনা এর আগে ইরাক যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়ন করা হয়েছিল। সব ঘটনাপ্রবাহকে একসাথে মিলালে মনে হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসন্ন। কিন্তু কেন? ইরানের বিরুদ্ধে কেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এই যুদ্ধ-যুদ্ধ সাজ?
বিষয়টিকে গভীরভাবে বুঝতে আপনাকে ইসরায়েলের ইনন পরিকল্পনা ও সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে হঠাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যর্থতাকে বুঝতে হবে।
জেরুজালেম পোস্টের সাংবাদিক ও ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন এর উপদেষ্টা ওদেদ ইনন হিব্র“ জার্নাল কিভউনিম এ ১৯৮২ সালে একটি আর্টিকেল লেখেন। যার নাম ছিল,‘এ স্ট্রাটিজি ফর ইসরায়েল হন দ্য ১৯৮০’স। ওদেদ ইননের এই আর্টিকেল থেকেই ‘ইনন পরিকল্পনা’ ধারণাটির উৎপত্তি। ওদেদ ইনন এর নামানুসরেই এর নামকরন করা হয়েছে ‘ইনন পরিকল্পনা’। এই ‘ইনন পরিকল্পনা’ হলো বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার একটি মহা পরিকল্পনা। এটিকে ইসরায়েলের সরকার, প্রতিরক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
এই ‘ইনন পরিকল্পনা’র দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে। একটি হলো- ইসরায়েলকে একক আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হতে হবে। আর অপরটি হলো-বিখন্ডীকরণ করে সব আরব রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটাতে হবে। এ বিভাজন নৃগোষ্ঠি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিভাজন রেখা বরাবর হবে। এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের আশ্রিত হবে। ইসরায়েল হবে সেগুলোর নৈতিক বৈধতার উৎস।
এই পরিকল্পনায় মিসর, লেবানন ও ইরাকের বিভাজনের কথা বলা হয়েছে। সিরিয়া, সুদান, ইরান, তুরস্ক, সোমালিয়া, পাকিস্তান, লিবিয়া ইনন পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। দেশগুলো ভেঙ্গে সেখানে তৈরী হবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ। যে রাষ্ট্রসমূহের টিকে থাকার মূল ভিত্তিই হবে ইসরায়েলোর চাওয়া বা না চাওয়া। রাষ্ট্রগুলোকে মূলত নিয়ন্ত্রণ করবে ইসরায়েল। সামরিক দিক দিয়ে তারা কখনই ইসরায়েলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে না।
মিশরের উত্তর অঞ্চলের একটা অংশে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে এই পরিকল্পনায়। ইরাককে ভেঙ্গে তিনটি রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে এতে। বসরা নগরীকে রাজধানী করে শিয়াদের একটি রাষ্ট্র, বাগদাদকে রাজধানী করে সুন্নীদের একটি রাষ্ট্র আর মসুলকে রাজধানী করে কুর্দীদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা হবে।
ইনন এর মতে তেল সমৃদ্ধ ইরাক ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকী। এবং বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পথে ইরাক বড় কৌশলগত বাধা। এই বাধা দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইরাক-ইরান যুদ্ধ বাধানো হয়। ২২ সেপ্টেম্বর১৯৮০-২০আগস্ট ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলে সে যুদ্ধ। এরপর ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসন, ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধ, ২০১১ সালে লিবিয়া যুদ্ধ, এবং বর্তমানে চলমান সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের যুদ্ধ সবই এই একই ইনন পরিকল্পনার অংশ।
‘ভাগ কর ও শাসন কর’ ব্রিটিশ নীতির এ যেন আর এক ইসরায়েলই সংস্করণ। ইসরায়েলের স্বপ্নদ্রষ্টা অষ্ট্রিয়ান সাংবাদিক থিওডর হার্জেল। তার বই ‘জুডেনস্টাট’ বা ‘ ইহুদি রাষ্ট্র’। এই বইতে ধর্মভিত্তিক উপখ্যান ও মিথোলজিকে ইতিহাসের সাথে মিশিয়ে খিচুড়ি পাকিয়ে তৈরী করা হয় ইসরায়েল রাষ্ট্র। যা ইহুদিদের জন্য ঈশ্বরের প্রমিজড ল্যান্ড বা প্রতিশ্র“ত ভূমি। তারাই ঈশ্বরের মনোনিত সম্প্রদায় বা চোজেন পিপল। মহাপ্রভু তাদের প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন যে দুধ ও মধুর এই দেশে তারা শান্তিতে বসবাস করবে। তা বটে! তবে তারা ইসরায়েলে শান্তিতে বসবাস করতে গিয়ে অন্যান্য দেশগুলোর শান্তি হারাম করে ফেলছে।
তো, ইহুদিদের এই ঈশ্বরের ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ বা ‘প্রতিশ্র“ত ভূমি’ কত বড়? ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসরে ৫৫ শতাংশ যে ফিলিস্তিনী ভূমি ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, সেইটুকু; না আরও বিশাল এই প্রতিশ্র“তভূমি? জায়নবাদের জনক থিওডর হার্জলের ধারণা অনুযায়ী, ইহুদি রাষ্ট্র মিসরের নদী নাহাল মিজারাইম তথা নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত পর্যন্ত বিস্তিৃত। রাব্বি ফিশমানের মতে, প্রতিশ্র“ত ভূমি ‘মিসর নদী’ থেকে ‘ফোরাত নদী’ পর্যন্ত বিস্তিৃত; সিরিয়া ও লেবাননের অংশবিশেষ এর অন্তর্ভুক্ত।
তার মানে হলো, এই বিশাল এলাকা জুড়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’-তে বৃহৎ ইসরায়েল প্রকল্পের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকারের দাবিকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সমঝোতায় লেবানন, জর্দান, সিরিয়া, ইরাক ও অন্যান্য দেশে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব দিতে বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৪ মে, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে উদ্বোধন করা হয়েছে। যে দিনটিকে ফিলিস্তিনীরা ‘নাকবা’ বা ‘বিপর্যয়ের দিন’ হিসেবে পালন করে থাকে। দিনটি অবশ্য ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার দিন।
মানে হলো, এক রাষ্ট্র সমাধান। শুধু ইসরায়েল থাকবে; ফিলিস্তিন বলে যা ছিল, তা মুছে যাবে। এখানে আপনিও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরীর মত প্রশ্ন করতে পারেন- তাহলে বর্তমানে বসবাসরত ফিলিস্তিনীরা কোথায় যাবে? যদি তাদের তাড়িয়ে দেওয়া না হয়- তাহলে তাদের নাগরিকত্বের ধরণ কিরূপ হবে? এই প্রশ্নের উত্তর অনগত ভবিষ্যতই দেবে।
ভবিষ্যত রেখে আমরা বর্তমানে আসি। ২৬ জানুয়ারি, ২০১১ সালে সিরিয়ায় শুরু হওয়া গণ বিক্ষোভ প্রদর্শন; যা অভ্যুথানে রুপ নিয়ে গৃহযুদ্ধ হিসেবে চলমান আছে। চলমান এই গৃহযুদ্ধে দুটি গ্র“প সক্রিয় আছে। এক-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত আইএস ও আল নুসরা সন্ত্রাসী বাহিনী। দুই- রাশিয়া, ইরান ও হিজবুল্লাহ সহায়তায় সিরিয় বাহিনী। সিরিয়ায় এখন মূলত চলছে প্রক্সি যুদ্ধ। এবং বলার অপেক্ষা রাখে না ইসরায়েল ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় পরাজিত হতে চলেছে। সিরিয়াকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করার ইসরায়েলের ইনন পরিকল্পনা বাস্তবে মার খেয়েছে।
এতেই ইরানের ওপর মহা চটেছে ইসরায়েল ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া ফিলিস্তিনীর হিজবুল্লাহর ওপর ইরানের প্রভাব প্রতিনিয়ত বাড়াতেও কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে ইসরায়েলের। ইরান হিজবুল্লাহকে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থ দিয়ে ইসরায়েলের বুকের ঠিক কাছটায় বড় ও শক্তিশালী করে তুলছে। যা ইসরায়েলের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। তাই হিজবুল্লাহকে ধ্বংস ও দুর্বল করতে এর উৎস ও অর্থদাতা ইরানকে ধ্বংস করা ইসরায়েল ও তার মিত্রদের এখন প্রধান এজেন্ডা।
বলা হয়ে থাকে- ইসরায়েল মাত্র দুই সময়ে হত্যা করে: শান্তিতে ও যুদ্ধে। ইসরায়েল সুনিদিষ্ট সীমানাহীন এক চলমান রাষ্ট্র। সুতরাং তার সেনাবাহিনীকেও চলমান থাকতে হয়। এই রাষ্ট্রটি জন্মের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যুদ্ধ করে টিকে আছে। নিজেকে নিরাপদ ও ধর্মীয় উপকথায় বর্ণিত বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েল রাষ্ট্রের সমস্ত যন্ত্র সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে জ্বলন্ত ও যুদ্ধাক্রন্ত মধ্যপ্রাচ্য হলো এই অঞ্চলের মানুষের চুড়ান্ত নিয়তি। আর ইরান হলো এখন বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান কাঁটা।

আমিন/১৯জুন/২০১৯

Comments are closed.